
বুযুর্গদের ঝুটা থেকে বরকত নেওয়া প্রসঙ্গে :
প্রশ্ন
:
সমাজে একটি কথা প্রচলন আছে যে, বুযুর্গদের ঝুটাতে বরকত আছ। অর্থাৎ, কোন নেকাকার মানুষ
যদি পানি পান করার পর কিছু থেকে যায় কিংবা কোন কিছু খাবারের পর কোন অংশ থাকে,
মুহাম্মদ বেলাল হোসাইন
ঢাকা।
উত্তর : আপনি যে বিষয়ে জানতে চেয়েছেন শরীয়তের পরিভাষায় এটিকে ‘তাবাররুক বি আসারিস সালিহীন’ বলা হয়। অর্থাৎ, নেককারদের ঝুটা (অবশিষ্ট খাদ্য বা পানি) বরকতের জন্য গ্রহণ করা যায়। অসংখ্য হাদীস দ্বারা বিষয়টি সুস্পষ্ট ও প্রমাণিত। হযরত সাহল বিন সা‘দ রা. থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পানীয় আনা হলো।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন তা থেকে পান করলেন। নবীজীর ডানে ছিল কম বয়সি কিছু সাহাবী আর বামে ছিল কিছূ বয়স্ক সাহাবী। সেই পানীয়র কিছু পান করে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ডানে থাকা কম বয়সি এক সাহাবীকে বললেন, তুমি কি অনুমতি দেবে যে, এই পানীয়র বাকী অংশ আমার বামে থাকা বয়স্ক সাহাবীদেরকে দেই?
সে বলল,
না ইয়া রাসুলাল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। আল্লাহর শপথ হে রাসুল (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমি আমার অংশ আপনি ছাড়া আর কাউকে অগ্রাধিকার দিতে পারি না। নবীজী
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন তার হাতেই তা দিয়ে দিলেন। (তিনি ছিলেন সাহাবী
হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ওয়া আনহুম, তাকমিলা ফাতহুল
মুলহিম : ৫২৫১)
(সহীহ্ বুখারী : ৫৬২০, সহীহ্ মুসলিম : ২০৩০)
এখানে স্পষ্টই এসেছে যে, ঐ সাহাবী নবীজীর পানকৃত পানীয় অন্য কাউকে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এর কারণ একটিই আর তা হচ্ছে, নবীজীর ঝুটা খুবই বরকতের বিষয়। তিরমিযী শরীফে (৩৪৫৫) সাহাবী ইবনে আব্বাস রা. এর এই বক্তব্য আরো সুস্পষ্টভাবে এসেছে।
সেখানে বর্ণনাকারী স্বয়ং আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেই। হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, ‘আল্লাহর শপথ! আমি আপনার ঝুটা আমার উপরে আর কাউকে অগ্রাধিকার দিতে পারি না। এখানে বিষয়টি একেবারেই সুস্পষ্ট।
হযরত
উম্মে সুলাইম রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, একবার রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
তখন, ঝোলানো
একটি মশক থেকে দাঁড়িয়ে পানি করলেন। আমি (হযরত উম্মে সুলাইম রাযিয়াল্লাহু আনহা) তখন
দাঁড়ালাম এবং সেই মশকের মুখটা কেটে নিলাম আমার কাছে তা সংরক্ষণের জন্য।
(সুনানে তিরমিযী : ১৮৯১)
এখানেও এ কথাটি স্পষ্ট যে, হযরত উম্মে সুলাইম রাযিয়াল্লাহু আনহা মশকের মুখটা কেটে সংরক্ষণ করেছিলেন শুধুমাত্র বরকতের জন্যই। কারণ, তাতে নবীজীর মোবারক মুখের বরকত লেগেছে। হযরত মুফতী তাকী উসমানী দা. বা. উক্ত হাদীস উল্রেখ করার পর লেখেন, সাহাবায়ে কেরামের প্রত্যেকেই একেকজন নবীজীর আশেক এবং জীবন উৎসর্গকারী ছিলেন।
যেমনটি আপনি উপরে দেখলেন যে, এই মহিলা সাহাবী মশকের মুখ কেটে নিজের কাছে সংরক্ষণ করে বললেন যে, এটা ঐ চামরা যা নবীজীর মোবারক ঠোট স্পর্শ করেছে। সামনে এটিতে আর কারো মুখ না লাগা উচিৎ। এখন এটি আর ব্যবহারের জন্য নয় বরং এটি তো বরকতের জন্য সংরক্ষণের মত। এজন্য আমি তা কেটে নিজের কাছে রেখেদিলাম।
হযরত মুফতী তাকী উসমানী দা. বা. আরো লেখেন, সাহাবী আবু মাহযুরা রাযিয়াল্লাহু আনহু যাকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কার মুআযযিন নির্ধারণ করেছিলেন। তিনি যখন মুসলমান হন তখন তিনি ছোট বাচ্চা ছিলেন এবং হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্নেহ করে তাঁর মাথার উপর হাত রাখেন। এরপর তিনি কোন দিন সেই চুল আর কাটেননি।
হযরত আবু মাহযুরা রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলতেন, এটা ঐ চুল যা রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম এর মোবারক হাত স্পর্শ করেছে। হযরত উম্মে সুলাইম রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বলেন, আমি দেখলাম যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক জায়গায় শুয়ে আছেন। গরমের মৌসুম ছিল তাই নবীজীর শরীর থেকে ঘাম ঝরছিল।
এজন্য আমি একটি শিশি নিয়ে নবীজীর ঘাম মোবারক সংরক্ষণ করলাম। এই ঘাম এত সুঘ্রাণ যে, মেশক আম্বরও তার কাছে তুচ্ছ, নগণ্য। আমি এটি খুশবু হিসেবে ব্যববহার করতাম এবং অনেকদিন যাবৎ তা আমার কাছে ছিল।
জনৈক মহিলা সাহাবী কোথাও থেকে নবীজীর একটি চুল পেল। তিনি বলেন, এই চুল আমি একটি শিশিতে পানি দিয়ে রেখে দিলাম। অত:পর যখন আমাদের গোত্রের কেউ অসুস্থ হতো, তখন এই শিশির এক ফোটা পানি অন্য পানির সাথে মিলিয়ে ঐ অসুস্থ ব্যক্তিকে পান করানো হতো। এর (নবীজীর চুলের) বরকতে আল্লাহ্ তায়ালা তাকে সুস্থ করে দিতেন।
হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, মক্কা থেকে মদিনা মুনাওয়ারায় যাওয়ার সময় রাস্তায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সকল স্থানে কখনো অবস্থান করেছেন, আমি সে সকল জায়গাতে অবতরণ করতাম। এবং দুই রাকাত নফল নামায আদায় করে নিতাম অত:পর সামনে চলতাম। আরেকটি বর্ণনায় তিনি নবীজীর ইস্তেনজাকৃত জায়গাতে ইসতেনজার জন্য বসার কথাও আছে।
এসমস্ত হাদীস থেকে স্পষ্ট হলো যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কোন জিনিস বরকত হিসেবে রাখা অথবা সাহাবা-তাবেঈন কিংবা ওলী-বুযুর্গদের কোন বস্তু বরকতের জন্য রাখাতে কোন খতি নেই।
(ইসলাহী খুতুবাত : ৫/২২০, ২২২-২২৭)
আশা করি এ আলোচনা থেকে প্রশ্নোক্ত বিষয়টি স্পষ্ট হয়েগেছে। ওয়া সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লাম। ওয়াল হামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন। সকল প্রশংসা আল্লাহর। তিনিই একমাত্র কর্মবিধায়ক।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
do not share any link