আমার
দেখা জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া ঢাকা :
২০০৮ সাল। শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. তখন বাহায়াত আছেন। খুবই অসুস্থ এবং কিছুটা আরযালে উমরের হালতে। এ বয়সেও হযরত মাদরাসায় থাকেন এবং দরস করান। একবার তো হযরত শায়েখ দা. বা. তাঁর কামরায় বলে উঠলেন এই আমার খাদেম গেল কোথায়? খাদেম বলল, হুযুর এই তো আমি। শায়েখ বললেন, আরে না। আমার খাদেমকে দ্রুত ডেকে আন।
তার মানে হযরত রহ. খাদেমকে চিনতে পারছেন না। এরকম হয়। শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রহ. আপবীতী কিতাবে লিখেছেনে, আল্লামা আব্দুল কাদের রাইপুরী রহ. যখন যিকির করে বের হতেন, তখন কাউকে চিনতেন না। এমনকি হযরতের খাদেমকেও চিনতে পারতেন না। এই অবস্থা প্রায় আধা ঘন্টা পর্যন্ত থাকত।
তো শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.ও তো সবসময় যিকিরে মশগুল থাকতেন। হযরতেরও সেই একই হালত হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। এজন্যই তিনি মাঝে মধ্যে তাঁর খাদেমকেও চিনতেন না। অনেক সময় হযরত শায়েখ রহ. দুআ‘ করতে করতে হাদীসের ব্যখ্যা শুরু করে দিতেন।
আমি
তখন নতুন :
সবেমাত্র ভর্তি হয়েছি মাদরাসায়। অনেক আশা এবং আগ্রহ নিয়েই এসেছি। এখানে সবাই আমার অপরিচিত। ভর্তি হলাম জালালাইন জামাতে। তখন জালালাইনের কামরা ছিল একদম নিচে। মানে বলতে পারেন মাটির নিচে। ভিতরে ঘুট ঘুটে অন্ধকার। বিদ্যুৎ চলে গেলে মনে হতো কবরের মধ্যে রয়েছি। সেখানে থাকা খুবই কষ্টকর মনে হতো। কিন্তু উস্তাযদের দেখলে মনটা জুড়িয়ে যেত।
মুফতী
তাওহীদুল ইসলাম সাহেব দা. বা.
আমাদের পাশেই থাকতেন মুফতী তাওহীদুল ইসলাম সাহেব হুজুর। অত্যন্ত যাওকী একজন মানুষ। আমাদেরকে হুযুর হেদায়া কিতাব পড়াতেন। অর্থনীতির উপর হুযুর ভালো যোগ্য এবং সীমাহিন দক্ষ। পাকিস্তানে তিনি এর উপর ভালো পড়া-শোনা করেছেন। দেখতে পাতলা হলেও মেধার দিক দিয়ে তিনি বেশ ভাড়ি। ইফতার তালিবুল ইলমদের পিছনে তিনি অনেক সময় দেন এবং মেহনত করেন।
মুফতী
হিফজুর রহমান সাহেব দা. বা.
তাঁর অপর দিকে থাকতেন মুফতী হিফজুর রহমান সাহেব দা. বা.। হুজুরের আখলাক ব্যবহার সবার থেকে একদম ভিন্ন। মাদরাসায় কেউ না থাকলেও দেখা যেত হুজুর আছেন তাঁর কামরায়। হুজুর তাঁর কামরায় বসে বসে কিতাব মুতালাআ‘ করছেন। এছাড়া হুজুরের আর কোন কাজই নেই। এত বয়স হওয়ার পরও হুযুর এত লম্বা সময় ধরে বসে থাকেন আশ্চর্য লাগে।
কোন সময় হুজুরকে আমি মুতালাআ‘ ছাড়া ভিন্ন কাজে দেখি না। দিনে কোন সময় হুজুরকে ঘুমাতেও দেখতাম না। সেই মেহনতের ফলই আজ তিনি দেখতে পাচ্ছেন। তাঁকে এখন পুরা বিশ্ব চিনে। হুযুর আমাদেরকে দিওয়ানে মুতানাব্বি পড়াতেন। এত সুন্দর তাঁর প্রকাশভঙ্গি তা বলাই বাহুল্য।
হুযুরের ঘন্টা ছিল যোহরের নামাযের আগের ঘন্টা। সাধারণত ছাত্ররা এসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু না। হুযুরের দরসে কেউই গাইরে হাযির থাকতো না। হুযুরের দরস ছিল বলা যায় পুরাটাই রম্য রসে ভরা। এমন এমন কথা বলতেন আর এত মজা করে পড়াতেন যে, ছাত্ররা একেবারে হেসে খুন।
মাওলানা
আশরাফুজ্জামান সাহেব দা. বা.
আমাদের সময় হুযুর ছিলেন সম্মানিত নাযেম সাহেব। তিনি মুফতি মানসুরুল হক সাহেবের খাস খাদেম ছিলেন। তখন তিনি আমাদের জামাতের সম্মানিত নেগড়ানও ছিলেন। অনেক সময়ই আমাদেরকে বসিয়ে বিভিন্ন নসীহত করতেন। একদিন তিনি বলছিলেন, তোমার নামাযে খুশু খুযু আছে কি না বুঝবে কিভাবে? আমার মতে তার একটা বিশেষ পদ্ধতি আছে।
আর তা হলো, একাকি যখন নামায পড়বে তখন নামায শুরু করার আগে চার রাকাত বা দুই রাকাত নামাযের কোন্ রাকাতে কি সুরা পড়বে তা নির্দিষ্ট করে নিবে। অত:পর নামাযে দাঁড়াবে। নামায শেষ করার পর দেখবে যে, তোমার নির্ধারণ করা সুরা দিয়ে কি তুমি নামায পড়তে পেরেছ?
না কি গড়বর হয়ে গেছে। যদি ঠিক থাকে তাহলে বুঝবে- তোমার খুশু খুযুর সাথে নামায আদায় হয়েছে। আর যদি তোমার নির্ধারিত সুরা ছাড়া অন্য সুরা দিয়ে নামায আদায় হয়ে যায় তাহলে বুঝবে তোমার খুশু খুযুতে ব্যঘাত ঘটেছে।
এছাড়াও
যারা ছিলেন :
তখন আরো অসংখ্য যোগ্য আসাতেযায়ে কেরাম ছিলেন। তাঁদের মধ্যে মুফতী মাহফুজুল হক, মাওলানা মামুনুল হক, মাওলানা হাসান আহমদ, মাওলানা নু‘মান আহমদ, গাজীপুরী হুযুর আল্লামা বাহাউদ্দিন সাহেব প্রমুখ।
গাজীপুরী
হুজুর দা. বা.
হুজুর সম্পর্কে দু-কলম না লিখলে ভালো লাগবে না। দরসের পাবন্দির ক্ষেত্রে হুযুরের কোন জুড়ি নেই। আমাদেরকে হুজুর জালালাইন শরীফ ১ম খন্ডের দরস দিতেন। হুজুর তখনই বৃদ্ধ। অথচ যোগ্যতায় এবং আকাবির-সালাফের প্রেরণায় সদা উজ্জিবিত। হুজুরের মুখেই সর্ব প্রথম শুনি হযরত থানভী রহ. এর অমীয় বাণী- العلم هو الحجاب الأكبر অর্থাৎ, ইলম হলো বড় একটি পর্দা।
কেউ দরসে গাইরে হাযির থাকার পর উপস্থিত হলে বলতেন, ‘আইছত ক্যা, পোস্তগলার ব্রিজের নীচে গিয়া আড্ডা দিবি’। এ ব্যাপারে হুযুর খুবই রাগ করতেন। কিছুতেই বরদাশত করতেন না। বছরের শেষে হুযুর যেদিন কিতাব শেষ করলেন সেদিন অত্যন্ত আদর করে আমাদের বললেন, দেখো বাবারা! গাইরে হাযিরি নিয়া আমি কেন তোমাদের সাথে রাগা রাগি করি। শোন!
আমি যখন পড়ছি কোন দিন কোন দরসে আমার গাইরে হাযিরি ছিলো না। লজিং বাড়ি ছিল এক মাইল দূরে। তবুও রোদ-বৃষ্টি বলে কথা নেই। শত কষ্ট হলেও দরসে উপস্থিত হয়ে যেতাম। আর এখন তোমরা কত বাহানায় দরসে গাইরে হাযির থাকো। জিজ্ঞাসা করলে বলে, আমার চাচাতো বোনের নাতির ভাগ্নির বিয়ে ছিলো তাই আসতে পারি নাই। এসবই আমার বরদাশত হয় না।
কেন
এই আলোচনার অবতারনা :
এখানে আমার আলোচনার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, জামিয়া রহমানিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কিছু কথা বলা। এক তো হলো, আমি এই মাদরাসা ও মাদরাসার আসাতেযায়ে কেরামকে যেমন- দেখেছি তার কিছু মুযাকারা করা। তাঁদের আখলাকী দিকগুলোর যৎসামান্য স্মৃতি তুলে ধরা। যা হবে জামিয়ার প্রতি আমার আবেগ ও ভালোবাসার কিছু মুহূর্তের দিন লিপি।
দ্বিতীয়
হচ্ছে, মামলা : ................
এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আর তা হচ্ছে, আল্লাহর শপথ করলে আমি হানেছ হবো না যে, আমার সেখানে পড়া-শোনা কালিন সময়ে কোন দিন এক মুহূর্তের জন্যও আমরা এটা শুনিনি যে, এই মাদরাসা এবং মুফতী মানসুরুল হক সাহেবের মাদরাসার মধ্যে দন্দ আছে। আশা করি আমার সাথে এ ব্যাপারে সবাই একমত হবেন। কারণ সেখানে পড়ুয়া ছাত্র তো আর কম নয়।
আমার বিশ্বাস তারাও কোন দিন কোন উস্তাযের মুখে এ ব্যাপারে কোন বক্তব্য শুনেনি। প্রচুর তালিবুল ইলম এমনও আছেন যারা এখানে পড়ে যান কিন্তু এ ব্যাপরে কিছুই জানেন না। এমনকি আমি কোন দিন কোন ছাত্রের মুখেও এ ব্যাপারে কোন আলোচনা শুনিনি। অথচ তখন আমাদের সাথে শায়েখ রহ. এর নাতী মাওলানা আব্দুল্লাহ্ সাহেবও পড়তেন।
সাধারণত এসব বিষয় ঘরওয়ালাদের কাছে বেশি শোনা যাওয়ার কথা। কিন্তু না। তিনিও কোন দিন এসব বিষয়ে আলোচনার অবতারনা করেননি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হতো, বোধহয় এখানকার কোন উস্তাযও এসব বিষয় জানেন না। অথচ মুফতী মানসুরুল হক সাহেবের পক্ষ করা মামলার মোকাবালা করে যেতে হতো মুফতী মাহফুজুল হক সাহেবের।
এজন্যই মুফতী মাহফুজুল হক সাহেব বলেছেন, এই বিশ বছরে মামলা-মুকাদ্দমাজাতীয় বিষয়গুলো একবার ছাড়া আমি কোন দিন তোমাদের সামনে আলোচনা করিনি। মুহতারাম উস্তায যথার্তই বলেছেন।
আমি
যেভাবে জানলাম মাদরাসা দখলের বিষয় :
তখন ছিল পরীক্ষার সময়। একদিন আমি আসরের নামাযের পর সাত মসজিদের একটি গুম্বুজের ভিতরে হেদায়া কিতাব পড়ছি। এমন সময় ৬-৭ বছরের একটি বাচ্চা আমার সামনে আসল। জিজ্ঞাসা করলাম কোথায় পড়। দুই একটি উত্তর দিয়ে বলতে লাগল, আপনাদের সাথে তো কথা বলা যাবে না। আমরা সেখানে দুইজন বসা ছিলাম। প্রশ্ন করলাম কেন কথা বলা যাবে না?
সে যে উত্তর দিল তাতে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। সে বলল, ‘আপনারা তো অবৈধভাবে আমাদের মাদরাসা দখল করে আছেন’। আল্লাহর কসম একটি কথাও আমি বানিয়ে বলছি না। ঐ সময়ের সেই বাচ্চাটির প্রতিচ্ছবি এখনো আমার সামনে ভাসছে।
আমি তখন আমার পাশে থাকা ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম এর হাকীকত কি? তিনি বলতে অস্বীকার করলেন। তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আমাদের উস্তাযগন কোন কথাই বলতে নিষেধ করেছেন। ঐ ভাই মাদরাসার প্রবীণ ছাত্র ছিলেন। আমিও আর বেশি জানতে চাইনি। ব্যস! এ সম্পর্কে এটুকুই আমার ইলেম।
দৃষ্টি
আকর্ষণ :
আচ্ছা বলুন তো! এই ৬-৭ বছরের মক্তবের একটি বাচ্চা এসব বিষয় জানল কি করে? সে তো মক্তব পড়ে। তার তো এখন এসব খুটিনাটি বিষয় বুঝবারই কথা নয়। কি করে হলো এটা? পরে খোজ নিয়ে জানতে পেরেছি, মুফতি মানসুরুল হক সাহেব এ বিষয়গুলো ইজতেমায়ী মজলিসে সব সময় আলোচনা করেন।
যেন সেখানকার সকল উস্তায-ছাত্রের মিশনই এটা। এরপর তো মুফতী মানসুরুল হক সাহেবের (আল্লাহ্ তাঁর উপর রহম করুন) অনেক বক্তব্য শুনেছি যাতে তিনি বরাবরই সকলের কাছে মাদরাসা আবার ফিরে পাওয়ার দুআ‘ চেয়েছেন।
মতের
ভিন্নতায় মানহাজের কী অভূতপূর্ব পার্থক্য! :
এক দিকে দ্বন্দের কী পরিমান প্রকাশ আর অন্য দিকে তার বিপরীতে আদবের কী সুন্দর বহিঃপ্রকাশ। ভুল সবারই হতে পারে। কিন্তু জেদি মনোভাবটা হয়তোবা কোন ফল বয়ে আনে না। আমরা আশাবাদী এ ব্যাপারে আল্লাহ্ তায়ালা উভয় পক্ষকে সুমতি দান করবেন এবং আমরা দুআও করি আল্লাহ্ তায়ালা যেন সকলের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলেন। উম্মতকে আল্লাহ তায়ালা বিচ্ছিন্নতা থেকে হেফাযত করেন। আমিন।
-মুহাম্মদ সাঈদুর রহমান সিদ্দিক নাটোরী
বিশিষ্ট লেখক, গবেষক, অনুবাদক ও খতীব।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
do not share any link