আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগন্জী রহ.

আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগন্জী রহ. এর সোহবতে কিছুক্ষণ 
সময়টা ছিল ৩১/১০/১৮ ইং রোজ বুধবার। আমরা ক‘জন রওয়ানা হলাম সিলেট হবিগন্জের উদ্দেশ্যে। গন্তব্য হবিগন্জ উমেদনগর মাদরাসা। উদ্দেশ্য হলো, হযরতুল আল্লাম মাওলানা তাফাজ্জুল হক হবিগন্জী রহ. এর সাথে মুলাকাত এবং একটি মাহফিলের জন্য দাওয়াত প্রদান।

মাদরাসায় কিছুক্ষণ অবস্থানের পর দেখলাম, হযরত রহ. বায়যাবী শরীফের দরস করাবেন। আমরা বায়যাবী শরীফের দরসে অংশগ্রহণ করলাম। দরসে বসে আমি যা বুঝেছি হয়তো জীবনে আর কারো কাছ থেকে তা বুঝা হতো না। 

আসল কথা হলো, এর আগ পরযন্ত আমি হযরত রহ. কে একজন আলেম এবং খানকাহী মেহনতের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব মনে করতাম। কিন্তু তিনি যে এত বড় আলেম এবং এমন যাহীন ও জায়্যিদ আলেম এর আগে আমার জানা ছিলো না। 

দরসে বসে দেখলাম, তিনি সংক্ষিপ্তভাবে মাত্র দুই একটি শব্দ বলেন আর এতেই বাইযাবী শরীফের প্রত্যেকটা ইবারতের শব্দ শব্দ পরযন্ত সম্পূর্ণ হল হয়ে যায়। আমি শুনছি আর অভিভূত হচ্ছি। আমার দৃষ্টিতে এ দেশে এমন সহজে কিতাব বুঝানেওয়ালা আর নযরে পড়েনি। 

হ্যাঁ, যোগ্যতা সম্পন্ন অনেকেই আছেন। কিন্তু এভাবে এত সহজে বুঝানোর যোগ্যতা কয় জনের আছে অন্তত আমি জানি না। যদি হযরত রহ. কে এ যুগের কাশমিরী, গাঙ্গুহী, মাদানী, বানুরী বলা হয় তাহলে আমার মতে একটুও অত্যুক্তি হবে না। 
 
মনে করতে পারেন আমি বাড়িয়ে বলছি। কিন্তু আল্লাহর শপথ না! আমি তখন অনেকের সাথে বলেছি, যদি আমার সুযোগ থাকতো, তাহলে আমি হযরত রহ. এর সান্যিধ্যে এক বছর পড়ে থাকতাম শুধু তার নুরানী ইলমের সামান্য ছিটে ফোটার কিছু পরশ নেওয়ার জন্য।

একবার তো দৃঢ় প্রতিজ্ঞাও করেছিলাম অন্তত কিছু দিন তাঁর সান্যিধ্যে থাকার। কিন্তু পরে আর তা হয়ে উঠেনি। এই সাক্ষাতের পর আবার সাক্ষাতের জন্যও বারবার দিন-তারীখ ঠিক করেও পরে আর যাওয়া হয়নি। এখন তো সেই কথা স্মরণ করে শুধু আফসোস করি আবার মাঝে-মধ্যে কান্নাও করে ফেলি।

কারণ, একবার হযরত রহ. কে দেখে তাঁর প্রতি আমার যে কী পরিমাণ মহাব্বত তৈরী হয়েছে তা আমি কোন ভাবেই বোঝাতে পারবো না। আমি মাঝে মধ্যেই হযরতের স্মৃতিচারণমুলক লেখা বইটি পড়ি এবং এতেই অনেক তৃপ্তি অনুভব করি। শত আফসোস! হযরতের ইলমের যথাযথ কদর হয়নি।

হযরতের ক্ষেত্রে ইমাম শাফেয়ী রহ. এর বক্তব্যটি শতভাগ মিলে যায়। ইমাম শাফেয়ী রহ. ইমাম মালেক রহ. এর ছাত্র ইমাম লাইস বিন সা‘দ সম্পর্কে বলেন, ‘তাকে তার ছাত্ররা নষ্ট করেছে’। (হাফেয ইবনে হাজার রহ. কৃত: আর-রহমাতুল গয়ছিয়্যাহ্ ফি তরজমাতিল লাইছিয়্যাহ্, প. ৬)

অর্থাৎ, ইমাম লাইস বিন সা‘দ এর ছাত্ররা উস্তাযের ইলম যেভাবে সংরক্ষণের দরাকর ছিল তা করেনি। তাই তারা তাকে মানে তার ইলমের ভান্ডারকে নষ্ট করেছে। হযরত রহ. সম্পর্কেও একই কথা। তাঁরও তো শাগরিদের অভাব নেই। কিন্তু ইলমেরে এই ভান্ডারকে সংরক্ষণ করতে পারেনি।

যাইহোক! বলছিলাম হযরতের সামান্য সাহচরযে থাকার কথা।
এরপর সাক্ষাত হলো।
সাক্ষাতপর্বে হযরত রহ. আমাদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে যা বলেছিলেন তা নিম্নরুপ :
 
১. খাদেমকে ডেকে বললেন, এদের জন্য চা নিয়ে এসো। খাদেম বলল, হযরত! চা-নাস্তা হয়েছে। হযরত রহ. বললেন, একবার খেলে কি আবার খাওয়া যায় না? অবশ্য আমি না খেলে আবার মেহমানরা খেতে চায় না।
 كبوتر با كبوتر با ز با باز
 
২. আমার উস্তায হযরত মাওলানা রসুল খান রহ. এর কাছে যখন কেউ দুআ‘ চাইত হুযুর সাথে সাথে হাত তুলে নগদ দুআ‘ করে দিতেন। দরস থেকে বের হলেন, একজন বললেন হুজুর দুআ‘ করেন। তৎক্ষণাত হাত উঠিয়ে হুযুর দুআ‘ করে দিতেন।

গেইট দিয়ে বের হচ্ছেন এমন সময় কেউ বলল, হুযুর দুআ‘ করেন। হুযুর সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে দুআ‘ করে দিতেন। রাস্তায় চলার পথেও যদি কেউ দুআ‘ চাইত হুযুর তখনও দুআ‘ করে দিতেন। এমনকি হুযুর ঘরে ঢুকছেন, এক পা ভিতরে আরেক পা বাহিরে এমন সময়ও কেউ দুআ‘ চাইলে হুযুর তখনও দুআ‘ করে দিতেন।

৩. আপনারা সবাই মুফতী। এখন কত মুফতী আর শাইখুল হাদীস; সাইকেল হাদীস। আমার এখানে ছয় মাস পড়েছে। রাস্তা দিয়ে যায়। জিজ্ঞাসা করলে বলে খুব ব্যস্ত।

৪. হযরত রহ. আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, নরসিংদীর তাবলীগের মারকায খুলেছে? একজন বললেন, ৪/১১/১৮ ইং একটা সম্মেলন হবে। তারপর হয়তো........। হুযুর বললেন,
পারলে তারা আলেমদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য কোথাও খুলে নিক। دستر نداريم گمے پيچے نداريم পাগরী নেই পাগরী বাধাও নেই। কেন তাদের সাথে মিলতে হবে? দুইটা তো আর হক হতে পারে না। হক তো একটাই। সুরা ‘কাফীরুন’ এর শানে নুযূল কী বলে? ‘লা আ‘বুদু মা তা‘বুদুন’।

৫. আপনারা উলামায়েকেরামের প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা/শোকরানা মাহফিলে যাবেন না। মৃত্যু পরযন্ত যেন আল্লাহ্ আমাকে এই সরকার প্রধানকে না দেখায়। সে তো ফাসেক। সেই তো সংবিধানে আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাসের কথা উঠিয়ে দিল। মুফতী আমিনী রহ. এর জন্য সংগ্রাম করে গৃহবন্দী থেকে চলে গেলেন।

সে শাপলাতে রক্ত ঝড়ালো। এখন আবার তাকে সংবর্ধানা? এমনকি আল্লামা আহমদ শফী দা. বা. তো বলেই ফেললেন, আওয়ামীলীগ হয়ে গেলেও কোন সমস্যা নেই। কারণ, আওয়ামীলীগের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা অর্থ দেয়।

তার প্রণীত এই সংবিধান মানলে আল্লাহর ফেরেস্তারা আমাদেরকে কী ফতোয়া দিবে? কারণ, ফেরেস্তারা দুআ‘ করে- 
اللهم اعط ممسكا تلفا وأعط منفقا خلفا
আর ফাসেকের প্রশংসা করলে আল্লাহর লা‘নত আসে। তাহলে ফেরেস্তারা আমাদেরকে কী ফতোয়া দিবে? এখন হাটহাজারীর ফতোয়া কোথায়?

অথচ পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান আর ফাতেমা আলী জিন্নার সময় নির্বাচনের আগে মুফতী আ‘যম ফয়জুল্লাহ্ রহ. ফতোয়া দিয়েছিলেন-
 فاطمه  نا اهل ہے اور ايوب خان فاسق ہے
হ্যাঁ, সংবর্ধনা হতো, যদি আলেমদের সকল মামলা প্রত্যাহার করে নেয় আর সংবিধান ঠিক করে নেয়। তাকে বলতে হবে, আমাদেরকে যেন সে মুসলমান হয়ে মরতে দেয়। অর্থাৎ, সংবিধান পরিবর্তন করে দেয়।

৬. হুযুর আগামী ২৬/১১/১৮ ইং আমাদের মাদরাসায় গিয়ে একটু দুআ করার দরখাস্ত। উত্তরে হযরত রহ. বললেন, না আমি পারবো না। আমার শরীলের অবস্থা খুবই খারাপ। দাওয়াত দাতা বললেন, গতকাল বিকালে হুযুরের সাথে কথা বলার পর হুযুর আসতে বলেছিলেন। হযরত রহ. বললেন, আপনারা না আসলে আপনাদেরকে আমি আর কোথায় দেখতাম। যোগাযোগ রাখবেন। আল্লাহ্ সুস্থ রাখলে তিনি যদি নেন......।

শেষ কথা : 
হযরত রহ. একজন মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ্ ব্যক্তি ছিলেন। এ সম্পর্কে তো অনেক ঘটনা আছে। আমি মাত্র একটি শুনাচ্ছি। আমাদের দাওয়াত করা নির্দিষ্ট তারীখে আমাদের মাদরাসায় আসার পর একজন হুযুরের কাছে বাচ্চা হওয়ার দুআ‘ চেয়েছিলেন। ৫ বছর যাবৎ তার বাচ্চা হচ্ছিল না। হুযুর মাহফিলের শেষে নিজ থেকেই দুআ‘ করলেন। আর পানি পড়া দিলেন। আল্লাহর ফযলে তার স্ত্রীর গর্ভে বাচ্চা এসেছিল।

আল্লাহ্ তায়ালা হযরত রহ. কে জান্নাতের আ‘লা মাকাম দান করুন। সকলের কাছে দরখাস্ত আমরা প্রত্যেকেই যেন হযরতের জন্য বেশি বেশি ঈসালে সওয়াব করি। আল্লাহ্ আমাদেরকে তৌফিক দান করুন। আমীন।
-মুফতী সাঈদুর রহমান সিদ্দীক নাটোরী
সংগ্রহনে : মাওলানা আব্দুল্লাহ্, ঢাকা।

1 মন্তব্যসমূহ

do not share any link

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

do not share any link

নবীনতর পূর্বতন