![]() |
জামার আস্তিন যখন কিতাবের লাইব্রেরী
তালিবুল ইলমদের কিতাবপ্রীতি আজকের নতুন বিষয় নয়। সেই সালাফ থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত ইলমী অঙ্গনে কিতাব সংগ্রহের বিষয়টি খুবই প্রকটভাবে দেখা যায়। যাদের মধ্যে রয়েছে মুতালাআ‘র পূর্ণ উদ্দমতা, আগ্রহ আর উদ্দিপনা, তারা কিতাব না কিনে থাকতে পারেন না। নিজের সাথে কিতাব না নিয়ে কোথাও যেতে পারেন না।
বিশিষ্ট মুহাদ্দিস হাফেয খতীব বাগদাদী রহ. এর কথাই ধরা যাক। এই মহান মণীষী সম্পর্কে হাফেয যাহাবী রহ. লেখেন, তিনি রাস্তায় হাটতেন আর কিতাব পড়তেন। (সিয়ার, ২০/৫৫৮-৫৫৯) এমন কিতাবপ্রেমীকের সংখ্যা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। তবে এ যুগে সালাফের মত কিতাবপ্রেমীক পাওয়া বড়ই দুস্কর। এখন তো সাধনা চলে গেছে সাধকদের কাছে আর,
অধ্যাপনা চলে গেছে অধ্যক্ষদের কাছে। বাকীরা সবাই পড়া-শোনা করে। তাই এখন আর কেউ বলেনা যে, আমি লেখা-পড়া করি। শুধু শোনে আর মন চাইলে একটু আধটু পড়ে। হয়তো আপনি শুনে থাকবেন ভ্রাম্যমান লাইব্রেরীর কথা। অর্থাৎ, লাইব্রেরী এখনকার মত এক জায়গায় পড়ে থাকতো না। সফরকারী সাথে শুধু কিতাব নয় বরং
কিতাবের লাইব্রেরী নিয়ে সফর করত। আর এখন রয়েছে ভ্রাম্যমান আদালত। তবে হ্যাঁ, এখনও যে সেই ইলমপ্রীতি একেবারেই নেই তা কিন্তু নয়। আজ আমি সে বিষয়ে কিছু বলছিনা। আমি আজ বলবো, একজন তালিবুল ইলম বা ছাত্র সফর রত অবস্থায়ও কিভাবে কিতাব বহন করতেন।
এক্ষেত্রে আমি মাত্র কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করব। তাও আবার মাত্র এক বিষয়ের উপর। অর্থাৎ, কিতাব তো তারা অনেকভাবেই বহন করতেন। তার মধ্যে একটি পদ্ধতি হচ্ছে, জামার আস্তিনের মধ্যে কিতাব বহন করা বা রাখা।
আস্তিনে আবার কিতাব রাখা যায়?
হ্যাঁ, এটা কোন কল্পনা নয়। বরং বাস্তবেই তারা কিতাব রাখতেন জামার আস্তিনে। তখন জামার আস্তিন অনেক প্রশস্থ হতো। যাতে অনেকেই অনেক কিছু রাখতেন। বিশ্বাস হচ্ছেনা তাই না? এটা বুঝার জন্য প্রথমে একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। ইমাম আবুল লাইছ সামারকান্দি রহ. লেখেন, (তাম্বীহুল গাফেলীন, পৃ. ৪০৭-৪০৮, ৯৯৪ নং, দারুল হাদীস কাহেরা)
বিশিষ্ট বুযুর্গ হযরত আব্দুল্লাহ্ ফারাজ রহ. বলেন, একদিন আমি আমার বাসার কাজের জন্য একজন লোক তালাশ করছিলাম। তো কেউ আমাকে একজন ব্যক্তির দিকে ইশারা করল। আমি দেখলাম, লোকটি খুবই সুন্দর। তার হাতে রয়েছে একটি পাল্লা ও টুকরি। আমি বললাম, আজ রাত পর্যন্ত তুমি আমার জন্য কাজ করতে পারবে?
সে এক দিরহামের উপর রাযি হলো। অতপর সে কাজ করল তিন জন মানুষ যা কাজ করে সে পরিমাণ। আমি ২য় দিনও কাজের জন্য তাকে সন্ধান করলাম। লোকেরা বলল, সে সপ্তাহে একদিনই থাকে। আর তা হচ্ছে, জুমার দিন। আমি সেই দিনটির অপেক্ষা করতে লাগলাম। অতপর আমি তাকে পেয়ে গেলাম।
সে আগের মতই এক দিরহামে কাজ করার জন্য রাযি হলো। তার সাথে ছিল সেই আগের মতই একটি পাল্লা ও টুকরি। আজও সে কাজ করল তিন মানুষের সমান কাজ। কাজ শেষে আমি তাকে দুই দিরহাম দিলাম। সে বলল, দুই দিরহাম কেন। কথা তো হয়েছিল এক দিরহামের। তুমি তো দেখছি আমার পারিশ্রমিকই নষ্ট করে দিলে।
না আমি তোমার কাছ থেকে কোন কিছুই নেব না। লোকটি কিছু না নিয়েই চলে গেল। আমার ভীষণ খারাপ লাগল। অতপর একদিন আমি তার উদ্দেশ্যে বের হলাম। লোকেরা বলল, সে অসুস্থ। আমি তার কাছে গেলাম। বাড়ীতে তার কিছুই নেই কেবল সেই পাল্লা আর টুকরিটা ছাড়া। আমি তাকে বললাম, জনাব! চলুন আমার বাড়ীতে। আমি আপনাকে সব রকমের সেবা দেব। সে তিনটি শর্তের উপর রাযি হলে।
আমি খাবার না চাইলে দিতে পারনে না। আমি মারা গেলে আমার পরিধেয় কাপড়েই দাফন করেবেন। আগের দুইটার চাইতে এটি আরো কঠিন। আমি আপনাকে পরে সব বলব। হযরত আব্দুল্লাহ্ বলেন, আমি তখন তার এই তিন শর্ত মেনে নিয়ে আমার বাড়িয়ে নিয়ে এলাম। যখন পরের দিন সকাল হলো, তিনি আমাকে ডাকলেন।
আর বললেন, এখন সেই তৃতীয়টি বলার সময় এসেছে। আমি এখন মৃত্যু মুখে উপনিত। এখনই আমি বিদায় নিয়ে চলে যাবো। আমি কি বলি তা মনযোগ দিয়ে শুনুন। আমার জুব্বার আস্তিনে একটি থলে রাখা আছে তা খুলুন। আমি খুললাম। দেথা গেল, তাতে সবুজ পাথরের একটি আংটি রয়েছে। সে বলল,
আমার মৃত্যুর পর আমাকে দাফন করে এই আংটিটি নিয়ে বাদশাহ্ হারুনুর রশীদের কাছে যাবেন এবং বলবেন, এই আংটিধারী ব্যক্তি আপনাকে বলেছে, আপনি এই ‘সকারাতের’ উপর মৃত্যু বরণ করবেন না। তাহলে আপনি লজ্জিত হবেন। আমি তার কথা মত তাকে দাফন করে বাদশাহ্ হারুনুর রশীদের কাছে গেলাম।
এবং পুরা ঘটানা বিস্তারিত তাকে শোনালাম। আর আংটিটা তাকে দিয়ে সেই কথাটুকুও শুনিয়ে দিলাম। সব শুনে বাদশাহ্ যারপরনাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। আমি কারণ জানতে চাইলে বললেন, সে আমার প্রথম স্ত্রীর ছেলে। তাদেরকে আমি বসরায় পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। আর বলেছিলাম, যখন শুনবে আমি মসনদে বসেছি তখন আসবে।
এরপর আর তাদের কোন খোজ নেই। আজ এতদিন পর তুমি আমার ছেলের সংবাদ এনেছে। অতপর বাদশাহ্ তাকে ১০০০ দিরহাম উপঢৌকন দিলেন.......। (তাম্বীহুল গাফেলীন, পৃ. ৪০৭-৪০৮, ৯৯৪ নং, দারুল হাদীস কাহেরা)
ঘটনাটি আমি সংক্ষেপে এখানে তুলে ধরলাম। আমার এটা লেখার উদ্দেশ্য হলো, তার জুব্বার আস্তিনে রাখা থলেটি। তো আমি বলেছিলাম, জুব্বার আস্তিনে সালাফের মধ্যে কিতাবও রাখা হতো। এবার আমি এ বিষয়ে আলোচনা করব। কয়েকটি ঘটনার মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে।
১ম ঘটনা :
হযরত বাকী ইবনে মাখলাদ রহ. (মৃত ২৭৬ হি.) সম্পর্কে হাফেয যাহাবী রহ. (সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ১৩/২৯৩ পৃ.) তে লেখেন, তিনি হযরত আহমদ বিন হাম্বল রহ. এর কাছে হাদীস শিখতে গিয়েছিলেন।
তখন ইমাম আহমদ রহ. এর উপর বাদশার পক্ষ থেকে খালকে কুরআনের মাসআলায় ঘর বন্দির সময় চলছে। তিনি সেই সুদূর আন্দালুস থেকে পায়ে হেটে তাঁর কাছে যান। তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গোপনে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, হে মহান ইমাম! আমি অনেক দূর থেকে এসেছি আপনার কাছে হাদীস শেখার জন্য।
ইমাম আহমদ রহ. বললেন, সম্ভবত তুমি জানো যে, আমার এখন ঘর বন্দির সময় চলছে। সকরকারিভাবে এসব এখন নিষেধ। হযরত বাকী বিন মাখলাদ রহ. বললেন, আমি একটা বুদ্ধি করেছি। প্রতিদিন আমি আপনার কাছে ভিক্ষুক সেজে আসবো। আপনি আমাকে কিছু দেওয়ার ভান করে অন্তত একটি করে হাদীস প্রতিদিন আমাকে শুনিয়ে দিবেন।
এতে তিনি সম্মতি জানালেন। এরপর থেকে আমি তার কাছে প্রতিদিন আসতে লাগলাম। আমার অবস্থা ছিল সাধারণ একজন ভিক্ষুকের মত। একটি লাঠি নিলাম আর গায়ে ময়লা কাপড় জড়ালাম। আর আমার কলম, দোয়াত এবং খাতা নিলাম আমার জামার আস্তিনে।
ভিক্ষুকের এই বেশ ধরে তার কাছে আসতাম আর হাদীস শুনতাম। এভাবে আমার কাছে তার থেকে ৩০০ হাদীস জমা হয়ে গেল। (সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ১৩/২৯৩, শুআইব আরনাউতের তাহকীক কৃত) এখানে হযরত বাকী বিন মাখলাদ রহ. জামার আস্তিনে কলম, দোয়াত আর খাতা বহন করেছেন। হ্যাঁ, আস্তিনের মধ্যে কিতাব বহনের ঘটনাও আছে সামনের ঘটনায়।
২য় ঘটনা :
হাফেয মুহাম্মদ ইবনুল মুসাইয়িব ইবনে ইসহাক রহ. (মৃত ৩১৫ হি.) সম্পর্কে হাফেয যাহাবী রহ. তাযকিরাতুল হুফফায পৃ. ২/৭৮৯ তে লেখেন, হাফেয আবু আলী নিশাপুরী রহ. বলেন, মুহাম্মদ ইবনুল মুসইয়িব রহ. মিসরে ইলম তলবের জন্য হাটতেন অথচ তার আস্তিনে থাকত এক লক্ষ হাদীস।
তখন আবু আলীকে জিজ্ঞাসা করা হলো, এটা কিভাবে সম্ভব যে, আস্তিনের মধ্যে এক লক্ষ হাদীস নিয়ে পায়ে হেটে চলতেন? উত্তরে তিনি বললেন, তিনি আস্তিনে ১০০ ‘জুয’ নিতেন আর প্রত্যেক ‘জুয’ এর মধ্যে ১০০০ হাজার করে হাদীস থাকত। লেখাগুলো খুবই ছোট ছোট হওয়ায় সাথে নেওয়া ও বহন করা সহজ হতো।
(সাফাহাত মিন সাবরিল উলামা পৃ. ৬২)
প্রসঙ্গত : এখানে ‘জুয’ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে চাচ্ছি। হাফেয যাহাবী রহ. ‘জুয’ শব্দের ব্যাখ্যায় (সিয়ার ২০/৫৫৮-৫৫৯, শুআইব আরনাউতের তাহকীক কৃত) লেখেন, ২০ পৃষ্ঠাকে এক ‘জুয’ বলা হয়। সুতরাং ছোট অক্ষরে বিশ পৃষ্ঠাতে ১০০০ করে হাদীস লেখা থাকত। আর এভাবেই তিনি এক লক্ষ হাদীস জামার আস্তিনের মধ্যে নিয়ে সফর করতেন।
৩য় ঘটনা :
হাফেয ইবনে দাসাহ্ রহ. বলেন, বিশিস্ট মুহাদ্দিস ইমাম আবূ দাউদ রহ. এর এক আস্তিন ছিল খুব প্রশস্ত আর অপরটি সংকির্ণ। জিজ্ঞাসা করা হলো, এমনটি কেন হতো? উত্তরে তিনি বললেন, প্রশস্ত আস্তিনে তিনি কিতাব রাখতেন আর অপর সংকির্ণ আস্তিনটি কোন কাজের জন্য ছিল না। এটিও হাফেয যাহাবী রহ. লিখেছেন।
(সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ১৩/২১৭)
৪র্থ ঘটনা :
হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনুল মুবারক রহ. বলেন, একদা আমি শামে ইমাম আওযায়ী রহ. এর কাছে গেলাম। তখন তিনি আমাকে লক্ষ করে বললেন, হে খুরাসানী! তুমি কি জানো কূফাতে আবু হানীফা (ইমামে আ‘যম) নামের বেদআতীটা কে? হযরত ইবনুল মুবারক রহ. কিছু না বলে সোজা নিজ ঘরে আসলেন।
অতপর ইমাম আবু হানীফা রহ. এর কিতাবসমূহ থেকে কিছু মাসায়েল লিখে ৩য় দিন ইমাম আওযায়ী রহ. এর কাছে আসলেন। তিনি আমার হাতে একটি কিতাব দেখে বললেন, এটা কি? আমি তখন তাকে সেই কিতাবটি দিলাম। তিনি বরাবর কিতাবটি পড়তে লাগলেন। এমন কি নামাযের সময় হলে তিনি
উক্ত কিতাবটি আস্তিনের মধ্যে রেখে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। নামাযা শেষে তিনি আবার কিতাবটি পড়তে লাগলেন। অতপর আমাকে লক্ষ করে বললেন, হে খুরাসানী! এই কিতাবে তো জায়গায় জায়গায় ‘নু‘মান বিন সাবেত’ বলেছেন’ উল্লেখ রয়েছে।
এই নু‘মান কে? আমি বললাম, ইরাকের একজন শায়েখ। ইমাম আওযায়ী রহ. তখন বললেন, ইনি তো অনেক বড় ইমাম। তুমি তাঁর কাছে গিয়ে বেশি বেশি ইলম অর্জন করো। আমি বললাম, ইনিই ইমাম আবু হানীফা যাকে আপনি বেদাতী বলেছিলেন।
অতপর ইমাম আওযায়ী রহ. বললেন, আমি তাঁর ইলমের আধিক্যতা আর আকলের পূর্ণতা দেখে ঈর্ষান্যিত হয়েছি। আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি, আমি তো সুস্পষ্ট ভুলের মধ্যে ছিলাম।
(আদাবুল ইখতিলাফ পৃ. ৭৯-৮০, শায়েখ আওয়ামা দা. বা. কৃত)
সারকথা :
এতটুকুর আলোচনায় এ কথাটি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সালাফের মধ্যে উলামায়ে কেরাম তাদের জামার আস্তিনের মধ্যে কিতাব বহন করতেন। এবার বুঝুন তাঁরা ইলম কিভাবে অর্জন করেছেন। আর উপরোক্ত ঘটনাগুলোতে আরো অসংখ ফায়েদা রয়েছে। আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে হাকীকী তালিবুল ইলম হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন। এযুগে ইলমের কদরের বড়ই অভাব। আল্লাহ্ হেফাযত করুন।
শেয়ার ও কমেন্ট করার জন্য ধন্যবাদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
do not share any link