ওমর ফারুক ত্রিপুরা হত্যা
সূচনা:
সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি হ্রদয় বিদারক ঘটনা ঘটেছে। বেন্ন্য ওরফে ওমর ফারুক ত্রিপুরাকে ১৮/০৬/২১ ইং রোজ শুক্রবার নির্মমভাবে ব্রাশফায়ার করে শহিদ করা হয়। সে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিল। অত্যন্ত নিরীহ একজন মুসলিম। তার অপরাধ সে একজন পাক্কা মুসলমান। মুসলিম হওয়াটাই তার দোষ। প্রশ্ন হলো, মুসলিম হয়ে কি এদেশে থাকতে নেই?
এটা আজ নতুন নয়। যুগ যুগ ধরে এভাবে শুধু মুসলিম হওয়ার অপরাধে শহিদ করা হয়েছে অসংখ্য মানুষকে। যাদের দোষ ছিল ইসলাম বা শুধু মুসলিম হওয়া। তাহলে কি আমাদের দেশে এমনটি হতে যাচ্ছে? এসব হত্যাকান্ডের বিচার না হওয়াই বলে দেয় দিন দিন আমাদের দেশ কোন্ দিকে হাটছে। শহিদ ওমর ফারুকের শাহাদাত আমাদেরকে হাদীসের একটি ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়।
শহিদ ওমর ফারুক রহিমাহুল্লাহ্ যেমন বাঁচতে চাননি, ঈমানের উপর অটল অনর থেকেছেন তেমনি হাদীসের ঐ ঘটনাতেও সেই মুসলমানগণ বাঁচতে চাননি। চেয়েছেন শাহাদাতের মৃত্যু; শহিদ হতে। চলুন শোনা যাক সেই হাদীসের গল্পটি।
কিভাবে শাহাদাতের পেয়ালা পান করলেন তারা?
জনৈক ববাদশাহ ছিল খুবই প্রতাপশালী এবং অহংকারী। ভীষণ দাপুটে ও তার একজন বিশেষ যাদুকর ছিল, যে সবসময় বিপদ-আপদ ও বালা-মসীবতে বাদশার পাশে থাকত। বাদশার দুর্দিনের সঙ্গি এই যাদুকর। এই যাদুকরকেই বাদশাহ্ তার জীবনের শেষ ভরসা মনে করে। আস্তে যাদুকর বৃদ্ধ হতে লাগল। বেশ বয়স বাড়ল তার।
যখন তার চুল দাড়ি সব পাকতে শুরু করল, একদিন বাদশাকে সম্বোধন করে বলল, জাহাপনা! আমার আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। কখন আমার মৃত্যু হয়ে যায় বলা যায় না। তাই আমার এই যাদু বিদ্যা শিখার জন্য একজন বালককে আমার কাছে পাঠান, যাকে আমার যাদু বিদ্যার সব জ্ঞান অর্পণ করে যাবো।
ফলে যাদুকরের কথা মত বাদশাহ্ একজন বালককে তার কাছে পাঠালো। বালক যে পথে যাদুকরের কাছে আসা-যাওয়া করত সে পথেই একজন মুসলমান থাকত। মানুষকে ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা দেওয়াই তার কাজ। একদিন বালকের কৌতুহল হলো সেই মুসলমানের মজলিসে বসার। করলও তাই। বসল এবং তার কথাগুলো মনযোগ দিয়ে শুনল।
মুসলমানের প্রত্যেকটি কথাই বালকের মনে ভীষণ দাগ কাটল এবং একদিনেই তার সাথে বেশ খাতির হয়ে গেল। এখন থেকে বালক যাদুকরের কাছে যাওয়ার্ আগে সেই মুসলিম দায়ীর কাছে যায় অত:পর রওয়ানা হয় যাদুকরের উদ্দেশ্যে। এভাবেই চলছে প্রতিদিন। এটাই এখন তার প্রত্যহ রুটিন।
একবারের ঘটনা :
একদা পথিমধ্যে ইয়া বড় এক প্রাণীর সম্মুখীন হলো বালক। লোকদেরকে ঘিরে রয়েছে প্রাণিটি। সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে। বালক মনে মনে বলল, দেখি তো আজকের দিনে যাদুকরের জ্ঞান শ্রেষ্ঠ না কি সেই মুসলিমের জ্ঞান?
অত:পর একটি পাথর হাতে নিয়ে বলল, হে আল্লাহ্! যাদুকর অপেক্ষা মুসলিমের জ্ঞানই যদি তোমার কাছে পছন্দের হয় তবে সম্মুখের এই প্রাণীকে ধ্বংস করে আমাদের চলাচলের ব্যবস্থা করে দাও। এই বলে পাথর নিক্ষেপের সাথে সাথে প্রাণীটির দফা রফা হয়ে গেল। বালক এবার খুব খুশি। দুআ‘ কবুল হয়েছে তার। সাথে সাথে এও জানতে পারল যে, মুসলমানই শ্রেষ্ঠ, যাদুকর ভালো নয়। আর হবেই বা কি করে? যাদুকর তো আর আল্লাহকে বিশ্বাস করে না। ধর্ম-কর্ম কিছুই না।
বালক সব ঘটনা মুসলমানকে এসে শুনালো। তখন তিনি বললেন, আজকে তুমি আমার চেয়েও শ্রেষ্ঠ। শুনে রাখো, অদূর ভবিষ্যতে তুমি মহাবিপদের সম্মুখীন হবে। খবরদার! আমার কথা কিন্তু কাউকে বলবে না। তাহলে কিন্তু আমরা কেউ বাঁচবো না।
এরপর আস্তে আস্তে বালক বড় হতে শুরু করেছে। জ্ঞান-গড়িমা থেকে শুরু করে বালক এখন সবদিক থেকেই বড়। অর্জন করেছে আসমানী বিদ্যা এবং আধ্যাত্নিক জ্ঞান। আল্লাহর কুদরতে সে এখন অন্ধ, বোধির, কুষ্ঠ রোগসহ আরো অনেক রোগ থেকে মানুষকে সুস্থ করে। ফলে মানুষ এখন দলে দলে বালকের কাছে আসে এবং সুস্থ হয়। হতে হতে এক পর্যায়ে দূর দূরান্তের গ্রাম-গন্জেও ছড়িয়ে পড়ে বালকের সুনাম সুখ্যাতি।
বাদশার অন্তরঙ্গ একজন বন্ধু ছিল অন্ধ। একদিন সেও অনেক হাদিয়া তোহফা নিয়ে বালকের দরবারে হাযির হয়ে বলল, আমাকে ভালো করে দিলে এ সবই তোমার। বালক বলল, না না! এ কি বলছেন! আমি তো কাউকে সুস্থ করি না, সুস্থ করেন একমাত্র আল্লাহ্ তায়ালা। আপনি মহান আল্লাহর উপর ঈমান আনলে আমি দুআ‘ করব, ইনশাআল্লাহ্ এতে আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন। তখন সে এক আল্লাহর উপর ঈমান আনল আর অমনিই তার চোখ ভালো হয়ে গেল।
কী বিস্ময়কর কান্ড?
বাদশার এই বন্ধু চোখ ভালো হওয়ার পর বাদশার দরবারে আসল। তার ভালো চোখ দেখে তো বাদশাহ্ অবাক! রীতিমত হতবাক! কে সে যে তোমার চোখ দুটো ভালো করে দিল? এমন মহৎ ব্যক্তি কি আর হতে পারে? উত্তরে সে বলল, তিনি আর কেউ না। তিনি আমার রব আল্লাহ্! বাদশাহ্ এবার উত্তেজিত হয়ে বলল, আমি ছাড়া আবার অন্য কোন রব আছে তোমার? সে বলল, তিনি তো আপনার, আমার এবং আমাদের সকলের রব।
এবার বাদশাহ্ আরো ক্ষিপ্ত হলো, তার জন্য জল্লাদ নির্ধারণ করা হলো। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বালকের কথা বাদশাকে বলে দিল। বাদশাহ্ এবার বালককে ধরে আনল। কষ্ট সইতে না পেরে বালক এবার সেই মুসলমানের কথা বলে দিল। তাকেও ধরে আনা হলো। সবার উপর চালানো হলো নির্যাতনের স্টিমরুলার। কিন্তু কেউই ঈমান ছাড়তে রাযি নয়। শেষ পর্যন্ত বালক ব্যতিত সবাইকে শহীদ করে দেওয়া হলো।
বালক কি তাহলে বেঁচে যাবে?
বাদশাহ্ এবার বালককেও ঈমান ছাড়তে বলল। বালকের এক কথা, আপনি যা পারুন করুন। আমি ঈমান ছাড়তে পারছি না। বাদশাহ্ তখন সৈন্যদল পাঠিয়ে বালককে পাহারের উপর থেকে ফেলে হত্যার নির্দেশ দিল। সৈন্যরা পাহারের চূড়ায় গিয়ে বালককে স্বজোড়ে নিচের দিকে নিক্ষেপ করল। বালকটি তখন আসমানের দিকে তাকিয়ে ফরিয়াদ করে বলল, হে আল্লাহ্! এ জালিমদের বিরুদ্ধে তুমি আমার জন্য যথেষ্ঠ হয়ে যাও। এভাবে দুআ‘ করা মাত্রই ভূমিকম্প শুরু হলো, পাহার কেঁপে উঠল। ফলে বাদশার সৈন্যরা পড়ে গিয়ে সবাই মারা গেল।
বেঁচে গেল শুধু বালক। কিন্তু পালিয়ে যায়নি। পায়ে হেটে সোজা বাদশার দরবারে হাযির। বাদশাহ্ তো অবাক! একি তুমি এখানে? বালক বলল, আমি তো আগেই বলেছিলাম আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট। বাদশাহ্ এবার আরেক দল সৈন্য পাঠিয়ে সমুদ্রে ডুবিয়ে মারার নির্দেশ দিল। সৈন্যরা তাকে নৌকায় উঠিয়ে সমুদ্রের মাঝখানে নিয়ে ফেলে দিল। তখন বালক আগের মতই আবার দুআ‘ করলে জাহাজটি সৈন্যদেরকে নিয়ে সমুদ্রে ডুবে গেল। আর বালক হেটে হেটে রাজ দরবারে হাজির।
এবার ভীষণ ভয় পেল বাদশাহ্!
বালকটি বাদশার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে। বাদশাহ্ ভাবছে, এ ব্যাটা কোন দেও-দানব নয় তো! বাদশার অবস্থা দেখে বালক বলল, জাহাপনা! আমাকে মারার একটা রাস্তা আছে আর তাহলো, প্রথমে রাজ্যের সকল জনগণকে এক জায়গায় জড়ো করবেন এবং আমার থলে থেকে একটি তীর বের করে বিসমিল্লাহি রব্বিল গুলাম বলে আমার দিকে তীর নিক্ষেপ করবেন।
এতেই আমার মৃত্যু হবে। বাদশাহ্ কী পাষাণ! শেষমেশ বালককেও হত্যা করে ফেলল। এহেন কর্মকান্ড দেখে দেশের সকল জনগণ মুসলামান হয়ে গেল। সুবহানাল্লাহ্। কিন্তু বাদশাহ্ কাউকেই বাঁচিয়ে রাখেনি। সকলকে হত্যা করে ফেলল। আসলে তাঁরা কেউ বাঁচতে চায়নি। সকলেই বরং শাহাদাতের পেয়ালা পান করে জান্নাতে যেতে চয়েছে। ফলে তাই হয়েছে। আর বাদশাহ্! সে তো জাহান্নামী। তার ঠিকানা তো শুধুই জাহান্নাম।
-সহীহ্ মুসলিম, ৩০০৫।
প্রিয় পাঠক! এমন সাহসী আর বীরপুরুষ কি এখনও আছে? শহিদ ওমর ফারুক রহ. এর শাহাদাত আমাদেরকে বলে দেয়ে হ্যঁ, এখনও আছে কিছু মানুষ যারা আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হতে চায়, দ্বীনের জন্য জীবন বিলিয়ে দিতে পারে। সর্বপরি হতে চায় জান্নাতের বাসিন্দা। আল্লাহ্ তায়ালা শহিদ ওমর ফারুক রহিমাহুল্লাহুকে জান্নাতের আ'লা মাকাম দান বরুন। তার গুনাহগুলো ক্ষমা করুন। এবং আমাদের তার থেকে শিক্ষা নেয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
do not share any link