
তিনি হলেন, আল্লামা সাইয়েদ মাহমুদ শাহ্ কাদেরী ইবনে সাইয়েদ মোবারক শাহ্ কাদেরী হানাফী আবুল ওয়াফা আফগানী রহ.। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু মনীষী গত হয়েছেন যারা নিজেদের জীবনকে ইলমে দ্বীনের জন্য ওয়াক্ফ করে দিয়েছিলেন।
দুনিয়াবী সকল সম্পর্ক ত্যাগ করে, সকল আরাম আয়েশকে বিসর্জন দিয়ে নিজেকে সাধারণ একজন তালিবুল ইলম হিসেবে পরিচয় দিতেন। খেদমত করতে গিয়ে তারা বিয়ে শাদি পর্যন্ত করেননি। দুনিয়াতে তাদের সন্তান ছিল তাদের লেখা কিতাব। এঁদেরই একজন হলেন আল্লামা আবুল ওয়াফা আফগানী রহ.।
জন্ম
১৩১০ হিজজরীতে যিনি জন্ম গ্রহণ করেছেন। শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ্ আবু গুদ্দাহ্ রহ. লেখেন, তিনি রাতের মুনাজাতে এবং সর্বদা কিতাব মুতালাআতে এত বেশি স্বাদ অনুভব করতেন যে, বিবাহ শাদি কিংবা ছেলে সন্তানের বিষয়গুলো কখনো কল্পনাই আসতো না।
আল্লামা আব্দুল হাই লাখনোভী রহ. এর ঘটনা তো প্রসিদ্ধ। তিনি কিতাব মুতালাআ করছিলেন। হঠাৎ তার পানি পিপাসা লাগল। সেজন্য তিনি খাদেমকে বললেন এক গ্লাস পানি আনতে। হযরতের পিতা এটা শুনে মনে মনে বলছিলেন,
দুনিয়া থেকে বুঝি ইলমি নিমগ্নতা উঠে গেছে। তা নাহলে মুতালাআ করছে আবার পানিও চাচ্ছে? এটা কেমন মুতালাআ! তাই বাবা খাদেমকে ডেকে বললেন, পানির বদলে গ্লাসে করে এক গ্লাস কেরোসিন তেল দিবে।
খাদেম কথা মত তাই করল। হযরত আব্দুল হাই লাখনোভী রহ. মুতালাআ রত অবস্থায় সেই তেলই পান করে ফেললেন। একটুও আন্দাজ করতে পারলেন না যে, এটা তেল না পানি। আমাদের আকাবিরদের মুতালাআর অবস্থা এমনই ছিল। আল্লামা আবুল ওয়াফা আফগানী রহ.ও এমনই এক ব্যক্তি ছিলেন যে, কিতাবের ব্যস্ততায় তিনি বিয়ে শাদি পর্যন্ত করেননি। ইলম মুতালাআর স্বাদে তিনি আজিবন ডুবে ছিলেন।
লাজনাতু ইহয়াইল মায়ারিফিন নু'মানিয়্যাহ্
তার একমাত্র ব্যস্ততা ছিল মুতালাআ এবং দুর্লভ দুষ্প্রাপ্য কিতাবের প্রকাশ করা। সে হিসেবে তিনি হায়দারাবাদে ‘লাজনাতু ইহইয়ায়িল মাআরিফিন নুমানিয়্যাহ্’ নামে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছিলেন। যেখান থেকে হাজারো মাখতুত পান্ডুলিপি তাহকীক করে কিতাব আকারে ছাপা হয়েছে।
সে হিসেব তিনি যেন একটি মাদরাসা, একটি কুতুবখানা। সর্বোপরি তার উপমা শুধুই তিনি। একই সাথে তিনি একজন মুহাদ্দিস ও ফক্বীহ্ও ছিলেন। তার ইলমী খেদমত আমাদেরকে সে কথাই বলে। কারণ, তিনি প্রায় সকল ফনেই কাজ করে গেছেন। তাই তো মরেও অমর হয়ে আছেন তিনি।
রচনাবলী:
হযরতের তাহকীকে এ পর্যন্ত যে সকল কিতাব ছাপা হয়েছে তার কিছু নিম্নে তুলে ধরা হলো :
- ইমাম আবু হানীফা রহ. কৃত কিতাবুল আছার এবং তার ব্যাখ্যা গ্রন্থ। ২ খন্ড। এই কিতাবটি পৃথিবী বিখ্যাত হাদিসের এক সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ। যার মশহুর চারটি নুসখা রয়েছে। বর্মানে এর দুইটিই ছাপা হয়েছে। একটি ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এর বর্ণনায়। ২য় টি ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর বর্ণনায়। হযরতের তাহকিক কৃত কিতাবুল আছারটি ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এর বর্ণনায়।
- ইমাম আবু ইউসুফ রহ. কৃত কিতাবুর রদ আলা সিয়ারিল আওযায়ী। ১ খন্ড
- ইমাম আবু ইউসুফ রহ. কৃত ইখতেলাফু আবী হানীফা ওয়া ইবনে আবী লাইলা। ১ খন্ড
- ইমাম মুহাম্মদ রহ. কৃত কিতাবুল আছল। ৫ খন্ড। এখন তো মাশাআল্লাহ্ কাতার থেকে ১৩ খন্ডে অন্য আরেকজনের তাহক্বীকে ছেপেছে। এই কিতাবুল আছলে প্রায় ২০০০ হাজারের মত হাদীস রয়েছে। বর্তমানে তো মাশাআল্লাহ্ শায়েখ লতিফুর রহমান বাহরায়েজী সাহেবের তত্বাবধানে ইমামে আযম আবু হানী রহ. এর হাদীস সমগ্র ২০ খন্ডে ছেপেছে। নাম হচ্ছে, আল মাউসুআতুল হাদীসিয়্যাহ্ লি মারবিয়্যাতিল ইমাম আবি হানীফাহ্।
- ইমাম মুহাম্মদ রহ. কৃত আল-জামিউল কাবীর। আর আল জামিউস সগীর আল্লামা আব্দুল হাই লাখনোভী রহ. এর তাহকীক ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা সহ এক খন্ডে ছেপেছে। নাম হচ্ছে, আন নাফিউল কাবির শরহুল জামিউস সগির।
- ইমাম তহাবী রহ. কৃত মুখতাসারুত তহাবী
- উসুলে সারাখসী। ১ খন্ড
- ইমাম সারাখসী কৃত শরহু যিয়াদাতিয যিয়াদাত।
- ইমাম জাসসাস রহ. কৃত কিতাবুন নাফাকাত।
- হাফেয যাহাবী রহ. কৃত মানাকিবু আবী হানীফা ওয়া সাহিবাইহি আবী ইউসুফ ওয়া মুহাম্মদ। এতে আল্লামা যাহেদ কাউছারী রহ. এর তা'লিকও রয়েছে। কিতাবটি ছোট হলেও তা অনেক মুল্যবান। প্রত্যকেরই তা সংগ্রহে রাখা উচিৎ।
- ইমাম বুখারী রহ. কৃত আত-তারীখুল কাবীর এর ৩য় খন্ড।
ইন্তেকাল :
১৩৯৫ হিজরীতে তিনি এ জগত ছেড়ে পরপারে পারি জমান। আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে তার ইলমী কাজ থেকে বেশি বেশি ইস্তেফাদা করার তৌফিক্ক দান করুন। আমিন।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
do not share any link