
how do qurbani rules hanafi
প্রশ্ন : কোনো ব্যক্তি যদি কুরবানির নিয়তে একটি পশু ক্রয় করে তবে কি তার জন্য ঐ পশুটি কুবানি করা ওয়াজিব হয়ে যায়? দলীলের আলোকে বিস্তারিত জানাবেন।
উত্তর : এটি একটি মতপার্থক্যপূর্ণ মাসআলা, যাতে স্বয়ং হানাফী মাযহাবের উলামায়েকেরামের মধ্যেই মতবেধ রয়েছে। প্রসিদ্ধ ফতোয়া হচ্ছে, ক্রয়ের দ্বারা গরিব ব্যক্তির উপর তা কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়। অতএব, যদি উক্ত পশুটি হারিয়ে যাওয়ার পর গরিব ব্যক্তি অন্য আরেকটি পশু কিনে এবং পূর্বের পশুটিও পাওয়া যায়, তাহলে তার উপর উভয় পশুই কুরবানী করা ওয়াজিব।
হানাফী মাযহাবের কিতাব সমূহে এ মতটিই বেশ জোড়ালোভাবে এসেছে এবং বর্তমানেও উলামায়ে কেরাম এর উপরই ফতোয়া দিয়ে থাকেন। তবে এক্ষেত্রে আমার মনে হয় আরো গবেষণা প্রয়োজন। এবং বর্তমানে মাসআলাও ব্যতিক্রম হওয়ার দাবি রাখে।
তাহলে বর্তমানে কি ফতোয়া হতে পারে?
আমি আগেই বলেছি যে, এ ব্যাপারে হানাফী মাযহাবে কয়েকটি মত রয়েছে। বাস্তব দলীলের আলোকে এবং একটি মতের বিশ্লেষণে এখন মাসআলার হুকুম ভিন্নরকম হতে পারে। তাই প্রথমে আমি এ ব্যাপারে কিছু বিশ্লেষণে যেতে চাই।
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ :
এ সম্পর্কে হানাফী উলামায়ে কেরামের তিনটি মত রয়েছে। আসলে এখানে কোনটি 'যাহেরি রেয়ায়াত' তা নির্ণয় করা অত্যন্ত মুশকিল। কারণ, কিতাবাদিতে তিনটি মতকেই 'যাহিরুর রেওয়ায়াহ্' বলা হয়েছে।
আর যাহিরুর রেওয়ায়ার যে ৬টি কিতাব রয়েছে তাতে এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোন বক্তব্য নেই। তাই আসলেই কোনটি 'যাহিরুর রেওয়ায়াহ্' তা নির্ণয় করা মুশকিল একটি বিষয়। যদি তা নির্ণয় করা যেত তাহলে ফতোয়া খুবই সহজ হতো।
১ম মত :
ধনি-গরিব সবাই সমান। অর্থাৎ গরিব পশু কিনলে যেমন তার জন্য ঐটা কুরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যায়। ঠিক ধনি ব্যক্তিও তদ্রুপ। অতএব ধনি এবং গরিব যে কেউ যদি কুরবানির নিয়তে পশু কিনে তাহলে তা কুরবানির জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যাবে। হারিয়ে গেলে আরেকটি কিনার পর আগেরটি পাওয়া গেলে ধনি-গরিব উভয়ের উপর দুইটাই কুরবানি করা ওয়াজিব। এটি ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ, ত্বহাবি, কুদুরি ও কতেক মুতাআখ্খিরিন আলেমের মত। এটিকে আল্লামা কাযিখান রহ. 'যাহিরুর রেওয়ায়াহ্' বলেছেন।
(দ্র. শরহুয যিয়াদাত : ৪/১১৭৫-১১৭৭, জামিউর রুমুয : ২/৩৫৯, ফাতাওয়া খানিয়াহ্ : ৩/৩৪৬, হিন্দিয়াহ্ : ৫/২৯৪, তাজরিদ : ১২/৬৩৩৮, শরহু মুখতাসারিত ত্বহাবি : ৭/৩৫৯-৩৬০।)
২য় মত :
ধনি-গরিব কারো জন্যই নিয়তের সাথে পশু কেনার দ্বারা তা কুরবানির জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যাবে না। অতএব, ধন-গরিব যে কেউ কুবানির নিয়তে পশু কিনার পর যদি হারিয়ে যায় এবং আরেকটি কেনার পর তা পওয়া যায় তাহলে দুইটাই কুরবানি দিতে হবে না।
ধনির উপর কুরবানি ওয়াজিব সেজন্য যে কোন একটি কুরবানি দিলেই চলবে। আর গরিবের জন্য যেহেতু কুরবানি দেওয়া ওয়াজিব নয় তাই সে কুরবানি না দিলেও চলবে। দিলে সবচে ভালো। আর কুরবানি যদি সে দিতেও চায় তাহলেও দুইটা দিতে হবে না। একটি দিতে পারবে। আবার একেবারে না দিলেও কোন সমস্যা নেই।
কারণ, কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার নেসাব তার নেই সে গরিব। আর কুরবানি দেওয়ার জন্য সে পশু কিনেছিল মাত্র। আর কেনার দ্বারা কুরবানি ওয়াজিব হয়ে যায় না। এ মতের স্বপক্ষে আছেন আল্লামা সারাখসি ও হালওয়ানি রহ.। এটি একই সাথে 'যাহিরুর রেওয়ায়াহ্' এবং 'নাদিরুর রেওয়ায়াহ্'। কোন কোন কিতাবে এটিকে জুমহুরের মতও বলা হয়েছে।
(দ্র. তাতারখানিয়া : ১৭/৪১১, খুলাসাতুল ফাতাওয়া : ৪/৩১৮-৩১৯, মুহিতে বুরহানি : ৮/৪৫৯, জামিউর রুমুয : ২/৩৫৯, মাবসূতে সারাখসি : ১২/১৭ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ্, তাকমিলাতুল বাহার : ৮/১৭৫, আল-বেনায়াহ্ : ১২/৩১, আল-কিফায়াহ্ মাআল ফাতহ্ : ৯/৫২৭-৫৩০, তাবইনুল হাকায়েক : ৬/৪৮২-৪৮৩, শরহুয যিয়াদাত : ৪/১১৭৫-১১৭৭।)
আমার মনে হয় :
খুব সম্ভব এটিই যাহিরুর রেওয়ায়াহ্। কারণ, শরিয়তে নিজের উপর কুরবানি ওয়াজিব করা এবং পশুকে কুরবানির জন্য নির্দিষ্ট করার পদ্ধতি একটিই- আর তাহচ্ছে মান্নত। আর মান্নত মুখে উচ্চারণ ছাড়া হয় না। শুধু নিয়ত বা উরফ দ্বারা মান্নত হবে না। বরং মান্নত সহীহ্ হওয়ার জন্য এমন শব্দ মুখে উচ্চারণ করতে হবে যা ইজাব ও এলতেযাম বুঝায়।
(দ্র. আল-মওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ্ আল-কুওয়াইতিয়্যাহ্ : ৪০/১৪০, মুহিতে বুরহানী : ৮/৪৫৯)
এটিও পূর্বেরটির মত 'যাহিরু রেওয়ায়াহ্'। কিন্তু প্রতম মতের মত হানাফী মাযহাবে এ মতের উপরও ফতোয়া দেয়া হয় না। বরং ফতোয়া তৃতীয় মতের উপর।
৩য় মত :
নিয়তের সাথে পশু ক্রয়ের দ্বারা শুধু গরিবের উপর তা কুরবানি দেয়া ওয়াজিব হবে, ধনির জন্য নয়। এটিও 'যাহিরুর রেওয়ায়াহ্'। হানাফী মাযহাবের প্রায় সকল উলামায়ে কেরামের সিদ্ধান্তও তাই। ফুকাহায়ে কেরাম এটিকেই তারজীহ্ দিয়েছেন। এর উপরই ফতোয়া দেওয়া হয়।
(দ্র. আল-ইখতিয়ার : ৫/২১, শরহুয যিয়াদাত : ৪/১১৭৭, হিদায়াহ্ মাআল বিনায়াহ্ : ১২/৩১-৩২, বিনায়াহ্ : ১২/৪৩-৪৪, মুহিতে বুরহানি : ৮/৪৫৯, ইনায়াহ্ মাআল ফাতহ্ : ৮/৪৩৫, বাদায়ে : ৪/১৯২, ফাতাওয়ায়ে শামি : ৬/৩২৫, তাকমিলাতুল বাহার : ৮/১৭৫, ১৭৬, আল-কাউকাবুদ দুররি : ১/৩৬৮, খুলাসাতুল ফাতাওয়া : ৪/৩১৮, জামিউর রুমুয : ২/৩৫৯-৩৬০, তাতারখানিয়া : ১৭/৪১১-৪১২, বাযযাযিয়াহ্ : ৬/২৯২, দরসে তিরমিযি : ৪/১৮৮, আল-ইযাহ্ : ২/৩৯১, মাজমাউল আনহুর : ৪/১৭০।)
সারকথা :
উপরে আমরা তিনটি মত উল্লেখ করেছি এবং লক্ষ করেছি যে, ফুকাহায়েকেরাম তিনটিকেই 'যাহিরুর রেওয়ায়াহ্' বলেছেন। কিন্তু আমি আমার এ ক্ষুদ্র তালাশে যাহিরুর রেওয়ায়ার কিতাবসমূহে সুস্পষ্ট ইবারতে এই তিন মতের কোনটি পাইনি।
যদি 'যাহিরুর রেওয়ায়াহ্' নির্ণয় করা যেত তাহলে মাসআলার সমাধান খুবই সহজ হত। খুব সম্ভব দ্বিতীয় মতটি 'যাহিরুর রেওয়ায়াহ্' হবে। কারণ, তা উসুল ও কায়েদার সাথে অধিক সামন্জস্যশীল এবং শরিয়তের তাকাযাও তাই।
কিন্তু ফুকাহায়ে কেরাম তাদের যুগের উরফের কারণে ৩য় মতের উপর ফতোয়া দিয়েছেন এবং এখনও দিচ্ছেন। আর উসুল হচ্ছে, উরফ পরিবর্তনের কারণে মাসআলার হুকুমও পরিবর্তন হয়। (শরহুল উকুদ : পৃ. ১১৯-১২০) তাই বর্তমান উরফের কারণে আমাদের জন্য ২য় মতানুযায়ী ফতোয়া দেওয়ার অবকাশ রয়েছে। উপরন্তু সেটাও 'যাহিরুর রেওয়ায়াহ্, সাথে সাথে নাদিরুর রেওয়ায়াহ্ও বটে।
তাই আমরা বলব :
আমাদের যুগে যেহেতু কোন গরিব ব্যক্তি কুরবানির জন্য পশু কিনলে তা মান্নতের মত মনে করে না (যেমনটি ফুকাহায়ে কেরামদের যুগে মনে করত) এবং ন্যূনতম নিজের উপর ওয়াজিব করার বিষয়টিও তার ধারণায় থাকে না বরং শুধুমাত্র নফল কুরবানির নিয়ত থাকে মাত্র তাই-
তার হুকুম ধনির হুকুমের মতই। অর্থাৎ গরিব মানুষ কুরবানির নিয়তে পশু কিনলে তা তার জন্য কুরবানি দেওয়া ওয়াজিব হয়ে যাবে না। সে চাইলে তা বিক্রি করতে পারবে, ব্যবসা করতে পারবে এমনকি সে চাইলে কুরবানি নাও দিতে পারে। তবে কুরবানি দিয়ে দেওয়াই উত্তম।
এমনই ফতোয়া দিয়েছেন হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রহ.। তিনি বলেন, (ইমদাদুল আহকাম : ৪/২২৩)
أن الراجح في شراء الفقير بنية الأضحيةرواية النادر عندي لأنهم عللوا ظاهر الرواية أن شراءه لها يجري مجرى الإيجاب وهو النذر بالتضحية عرفا فظهر أن بناءه على العرف فيمكن أن يكون الإيجاب متعارفا في عصرهم وأما في زماننا فليس الإيجاب متعارفا في شراء الفقير أصلا بل المتعارف نية التطوع ولا يخطر معنى النذر بشراءه في بال أحد هذا والله أعلم
আখেরী গুযারিশ :
যদিও থানভি রহ. এ মতের উপর ফতোয়া দিয়ে গেছেন কিন্তু বর্তমানে উলামায়ে কেরাম তার উপর ফতোয়া দেননা বিধায় এর উপর ফতোয়া না দেওয়ার অনুরোধ করা হলো। আর উলামায়ে কেরামের কাছেও আবেদন থাকবে, তারা যেন এ বিষয়ে গবেষণা করার প্রয়াস পান এবং এ বান্দার মত ভুল হলে তা সতর্ক করেন। সকল প্রসংশা একমাত্র আল্লাহ্ তায়ালার।
লিখনে :
বান্দা মুহাম্মদ সাঈদুর রহমান সিদ্দীক নাটোরী
খাদিমুত ত্বলাবা 'আত তাখাসসুস ফিল ফিকহি ওয়াল ইফতা' মারকাযুল উলুমিদ দ্বীনিয়্যাহ্, ভেলানগড়, নরসিংদী।
সংগ্রহে :
মাওলানা আব্দুল্লাহ্
ঢাকা।
অনেক বিশদ আলোচনা থেকে সংক্ষেপিত।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
do not share any link