মাওলানা আব্দুল্লাহ্

ইসলামী ইতিহাসের টুকরো কথা

বারকা খান ও তুঘলক  তাইমুরের ইসলাম গ্রহণ

আমি আজ ১২ শতাব্দীর ইসলামি ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছিযে সময়টা ছিল ইসলামি ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় সেলজুক সালতানাতের সময়কার কথা তখন ক্ষমতায় ছিলেন  সুলতান আলা উদ্দিন খাওয়ারিজম। তার অসাবধানতা ও ভুলের কারণে  কটা বিপর্যয় ঘটেছিল। একালো অধ্যায়ের খলনায়ক ছিল,

তাতারি বা মঙ্গলদের মহানেতা চেঙ্গিস খান। সে এমন লোক, যে জিরো থেকে হিরো হয়েছিল  সাধারণ থেকে হয়েছিল অসাধারণ যাইহোক। সুলতানের ভুলের কারণে সে ক্ষিপ্ত হয়েছিল। যে ভুলের মাশুল দিতে পারেনি সুলতান। সে এক হৃদয়বিদায়ক দৃশ্য,  যার বিবরণ লিখতে হাত কেঁপে ওঠে 

এমন ভয়াবহ ও ভয়ংকর তুফান ছিল,  যেখানে কেউ স্হীর থাকতে পারেনি এবং স্হীর থাকার  চিন্তা করেনি। যে প্রতিরোধ বা প্রতিবাদ করেছে,  সে তাদের খাবারে পরিণত হয়েছে। তারা তাকে, তার স্ত্রী ও সন্তানাদিকে, এমনকি তার সকল আত্মীয় স্বজনদেরকে নির্বিচারে হত্যা করে, লাশের স্তূপ করে রেখে দিতো। সে এক দীর্ঘ কাহিনী। অন্য সময় না হয় লিখব

আমি সুলতানের কি ভুল ছিল তা নিয়ে কিছু আলোচনা করতে চাইএকদিন  সুলতান আলা উদ্দিন মুহাম্মদ খাওয়ারিজম এক মগ্ঙল ব্যবসায়িককে হত্যা কর চেঙ্গিস খান  তাদের হত্যার কারণ জানার জন্য সুলতানের কাছে দূত পাঠালোসুলতান বাছ-বিচার না করে তাদেরকেও হত্যা করে ফেলল

যার কারণে চেঙ্গিস খান জ্বলন্ত অঙ্গারের ন্যায় জ্বলে উঠ এবং সুলতানের উপর হামলা করে বস  এরপর পুরো ইসলামি রাষ্ট্রের উপর আক্রমণ কর এই সময়  থেকে মঙ্গল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। মঙ্গল সাম্রাজ্য ১২০৬-১৩৬৮ইং পরযন্ত ছিল এ সময়টাই ছিল মুসলমানদের কালো দিনইতিহাসের এক কালো অধ্যায়।

মুসলিম মা-বোন ও শিশুদের উপর চলছিল নির্যাতনের স্টিমরোলার। এতদসত্ত্বেও  কিছু বীর মুজাহিদ ও দ্বীনের দায়ী ইসলামী দাওয়াত নিয়ে পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েন। যাদের আত্মত্যাগ ও দাওয়াতে অনেকে আলোর দিশা পেয়েছে।

হককে হক এবং বাতিলকে বাতিল হিসেবে চিনতে পেরেছে। এদের মধ্যে ছিল দুই জন মহান ব্যক্তি যাদের আলোচনা আমার মুখ্য উদ্দেশ্য। তারা হলেন চেঙ্গিস খানের নাতি বারকা খান ও তুঘলক তাইমুর। যারা মহান র্গদের দাওয়াতে ইসলামের ছায়া তলে এসেছেন।

বারকা খান এর পরিচয় ও ইসলাম গ্রহণ 

বারক খান (মৃত্যু:১২৬৭) মঙ্গোলীয় তাতার  চেঙ্গিস খানের নাতি ছিলেন এবং তার বড় ছেলে জুচির ছেলে ছিলেন। তিনি একজন মোঙ্গল সেনাপতি তিনি ১২৫৬১২৬৭ পর্যন্ত গোল্ডেন হর্ড শাসক ছিলেন এবং নীল

সাম্রাজ্য সাদা সাম্রাজ্যের উপর শাসন করতে পেরেছিলেন। নীল সাম্রাজ্যে তিনি তার ভাই বতু খানের স্থলাভিষিক্ত হন এবং প্রথমবারের মতো মঙ্গোল সাম্রাজ্যের একটি থানাতে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন।

তার ইসলাম গ্রহণের রহস্য

একদিন  বুখারা থেকে একটি কাফেলা তার এলাকায়  আগমন করে। ঐ কাফেলায় দুজন মুসলমান বণিক ছিলো যারা অভিজ্ঞ আলেম ছিলেন। বারকা খান তাদেরকে আলাদা করলেন। তাদের পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তারা তাদের পরিচয় দিলেন। যখন বারকা খান জানতে পারলে  যে, তারা মুসলমান তখন তাদের থেকে ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাইলেন।

তারা অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষায় ইসলাম সম্পর্কে অকাট্য যুক্তি প্রমাণের আলোকে তাকে বুঝালেন। বারকা খান তা শুনে এতোই মুগ্ধ ও অভিভূত হলেন যে, তৎক্ষনাৎ তিনি ইসলাম কবুল করেন। আর তার ছোট ভাইকেও ইসলাম গ্রহণের প্রতি  উৎসাহিত করেন।  ফলে তিনিও ইসলামের ছায়া তলে আসেন।

ুঘলক তাইমুর এর পরিচয় ও ইসলাম গ্রহণ

তুঘলক তাইমুর চেঙ্গিস খানের তিন নাম্বার ছেলে চাগতাই খানের বংশদ্ভূত ছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন বুখারার বুযূর্গ শায়েখ জামাল উদ্দিনের ছেলে শায়েখ রশিদ উদ্দিনের মাধ্যমে। একদিনের ঘটনা ুঘলক তাইমুর শিকাররত ছিলেন। শায়েখ জামাল উদ্দিন কাশগরে আসেন। কাশগর ছিল তাইমুরের শাসনাধীন এলাকা। তাইমুরের কাছে এই সংবাদ পৌঁছে যে,

কাশগরে অপরিচিত কিছু লোক এসেছে। তাইমুর তাদেরকে সামনে আনার জন্য ফরমান জারি করেফরমান অনুযায়ী তাদেরকে হাজির করা হলো অত:পর তাদের পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলো। তারা পরিচয় দিলেন। কথা শুনে সে বুঝতে পারলো যে, তারা ইরানী। তাই তাচ্ছিল্যের সুরে বললো,

(একটি কুকুরের দিকে ইশারা করে) কুত্তা উত্তম। ইরানীদের মধ্যে ছিলেন শায়েখ জামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, আপনি সঠিক বলেছেন। যদি আমরা দ্বীনে হকের উপর না থাকি, তাহলে এ কুত্তা উত্তম। তাইমুর জবাব শুনে চমকে গেল। আদেশ জারি করলো, মি শিকার থেকে ফিরলে তাদেরকে আমার সামনে হাযির করবে৷

ফরমান মুতাবেক তাদেরকে হাযির করা হলো। তাইমুর শায়েখকে আলাদা করে নিরিবিলি জায়গায় নিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি তখন দ্বীনেকের কথা বলেছিলেন। দ্বীনে হক বলতে কী বুঝাতে চেয়েছেন? শায়েখ তখন অতি আগ্রহ ও জোশে ইসলামের বিধি বিধান ও আরকান সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা দিলেন এবং কুফরি ভয়াবহতার রুপ রেখা তুলে ধরলেন।

তুলক তাইমুর খন নিজের ধর্মের ব্যপারটা বুঝতে পারলেন এবং শায়েখের কথাগুলো বিশ্বাস করলেন। তবে তাইমুর এতটুকু বললেন, আমি যদি এখন মুসলাম  হওয়া প্রকাশ করি, তাহলে অন্যদের সঠিক পথে আনতে পারবো না। অতএব, কিছু দিন অপেক্ষা করুনযখন আমি  চাগতাই সলতানাতে অধিষ্ঠিত হবো তখন আপনি আমার কাছে আসবে

যাইহোক! শায়েখ নিজ দেশে ফিরে গেলেন। হঠাৎ শায়েখ কঠিন রোগে আক্রান্ত হন। মৃত্যুর আগ মূহুর্তে ছেলে রশিদ উদ্দিনকে ডেকে বলেন, হে ছেলে! তুঘলক তাইমুর একদিন বড় বাদশা হবে।

তুমি তার কাছে যাবে। আমার কাছে তার দেওয়া ওয়াদা কথা স্বর করিয়ে দিবে। কয়েক বছর পর  ‍তুলক তাইমুর  বাদশা হয়। রশিদ উদ্দিন বাবা দেওয়া ওসিয়ত পূরণে লক্ষে

একদিন  তাইমুরের সৈন্যবাহিনিতে প্রবেশ করেন। একজন সৈন্য টের পেয়ে যায়। সে যখন বাদশা তাইমুরের তাবু দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখনই তাকে আটক করে ফেলে পরের রাত্রে ঠিক ফজরের সময় আজান দেওয়া আরম্ভ করেন। বাদশা তাইমুরের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। বাদশা তাকে তলব করলেন। ফলে তাকে উপস্থিত করা হলো।

রশিদ উদ্দিন নিজের পরিচয় দিলেন এবং বাবার ওছিয়তের কথা স্বরন করিয়ে দিলেন। সাথে সাথে বাদশা তাইমুর ইসলাম গ্রহণ করলেন। বাদশা ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটা প্রজাদেরকে বললেন ফলে প্রজাগণও ইসলামের ছায়া তলে আসেন। প্রবাদ আছে, প্রজা চলে বাদশার রীতিমতের উপরে। তাই........।

(তারীখে দাওয়াত ও আযীমাত, ১ম খন্ড)

পরিশেষে :

পরিশেষে আমি বলতে চাই, ইসলামি সভ্যতা পিছনে  রয়েছে মহান সত্তার চ্যালেঞ্জকর  শক্তি। যাকে পরাভূত করতে পারেন কেউ, কোন শক্তি। বরং যেই অপচেষ্টা চালিয়েছে সে ব্যর্থ হয়েছে। আল্লাহর বাতি জ্বলে উঠেছে দিবালোকের ন্যায়। যদিও শত্রুরা অপছন্দ করেছে

ফেরাউন খুজেছে  মুসাকে, পেলেই তাকে হত্যা করবে। অতিনি প্রিতিপালিত হয়েছেন তারই বিবি আছিয়া কোলে। মারে আল্লাহ রাখে কে, রাখে আল্লাহ মারে কেএ হলো  রবের নীতি তাই বর্তমানে আমাদের একমাত্র লক্ষ হওয়া উচিৎ, পৃথিবীর সর্বত্র হকের মশাল জালিয়ে দেওয়া। তবে তা হবে সালাফের নীতিতে।

আকাবিরের অনুসরণে। সেই পথ ও পন্থা, চিন্তা ও চেতনার অনেক কিছুই আছে পূর্বোক্ত ইতিহাসে। অতএব, আমাদের আগানো উচিৎ অত্যন্ত কৌশলে এবং সুচিন্তিত পদ্ধতিতে। আল্লাহা তৌফিক দান করিুন। আমীন।

-মাওলানা আব্দুল্লাহ্

সিনিয়র মুহাদ্দিস-

দক্ষিণখান দারুল উলূম

মাদরাসা, ঢাকা।


Post a Comment

do not share any link

নবীনতর পূর্বতন