
ইমাম আবু হানীফা কি হাদীস সম্পর্কে অজ্ঞ?
আমরা অনেকেই ইমাম আবু হানীফা রহ. হাদীস শাস্ত্রে মর্যাদা সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। ভিন্ন মতাবলম্বীরা যখন আমাদের ইমামকে নিয়ে আপত্তি তোলে আমরা তখন কোনো কথাই বলতে পারি না।
এটা আমাদের দুর্বলাতা যে, আমাদের ইমামকে নিয়ে পড়ে শোনা করি না। তাই আজ আমি শুধু ইমাম আবু হানীফা রহ. এর কিছু জাবনী গ্রন্থের নাম উল্লেখ করছি, যাতে আমরা কিছুটা হলেও ধাণা অর্জন করতে পারি।
প্রথমে কিছু কথা :
ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহ. পৃথিবী বিখ্যাত সুপ্রসিদ্ধ ইমাম চতুষ্টয়ের একজন। যুগ যুগ ধরে মুসলিম উম্মাহ্ যাকে ইমাম আ’যম হিসেবে স্বীকৃতি দিয় আসছে। হাদীস, ফিক্বহ্ সহ শরীয়তের সকল বিষয়ের শীর্ষ চূড়ায় যিনি উন্ননিত ছিলন। আল্লামা ইবনে নাদীম রহ. যার সম্পর্ক বলেছেন, তাঁর ইলম পৃথিবীর আনাচে-কানাচে, জলে ও স্থলে, পূর্ব- পশ্চিমে বিস্তৃত হয়ে আছ। (আল-ফিহরিস্ত, পৃ. ২৮২)।
তাঁর ইলমী কারনামার কথা আমি আর কি লিখব? ইমাম আব্দুল্লাহ্ ইবন দাঊদ আল খুরাইবী রহ. এক কথায় যার ইতি টেনেছেন, ‘ইমাম আবূ হানীফার ইলমী খেদমতের কারণে সকল মানুষের তাঁর জন্য তাদের নামাযে দুআ করা উচিৎ। (মাকানাতু আবী হানীফা ফিল হাদীস, প. ১০৯)।
হাফেয ইবন হাজার রহ. বলেন, ইরাকে ফিক্বহর নেতৃত্ব ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহ. এর কাছে শেষ হয়েছে। (আল-ইন্তেকা, পৃ. ১১৯)। ইমাম আবূ হানীফা রহ. যুগ শ্রেষ্ঠ একজন তাবেয়ী ছিলন। (দেখুন: মাকানাতু আবী হানীফা; ১০৫-১০৬, ১০৮, ১১৬, ১৬৭, তানীবুল খতীব; ৩২-৩৩, ৪১-৪৪।
আল্লামা আব্দুশ শহীদ নু’মানী দা. বা. এ ব্যাপার স্বতন্ত্র একটি গ্রন্থই রচনা করেছেন। যার নাম দিয়ছন, ‘ইমাম আবু হানীফা কি তাবিইয়্যাত আওর সাহাবা সে উনকি রেওয়ায়াত। আগ্রহী পাঠক তা পড় দেখত পারেন।
একদা ইমাম আবূ হানীফা রহ. তাবেয়ী হযরত আ’মাশ রহ. এর কাছে ছিলেন। যখন ইমাম সাহেবকে কােন মাসআলা জিজ্ঞাসা করা হতাে তিনি বলতন, এই মাসআলায় আমার মতামত এই...। হযরত আ’মাশ রহ. বলতেন, কী দলীল আছ তােমার কাছে?
ইমাম আবূ হানীফা রহ. বলতেন, আপনিই তাে আমাকে আবূ সালেহ্ এর সূত্রে হযরত আবূ হুরাই রা. থেকে, আবূ ওয়াইল এর সূত্রে হযরত ইবনে মাসঊদ রা. থেকে, আবূ ইয়াস এর সূত্রে হযরত আবূ মাসঊদ আনসারী রা. থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
যে ব্যক্তি কল্যাণের দিকে পথ দেখায় অন্যের আমলের অনুরুপ সাওয়াব তার জন্যও লেখা হয়। এমনিভাবে হযরত হুযাইফা, জাবের, আনাস রা. থেকে আরাে অসংখ্য হাদীস আপনি বর্ণনা করেছেন। তখন হযরত আ’মাশ রহ. বললেন, ব্যস, যথেষ্ট! আমি একশ’ দিনে তােমার কাছে যত হাদীস বর্ণনা করেছি তুমি এক মূহুর্তে তা শুনিয়ে দিলে।
আমি তাে জানতামই না যে, তুমি এসব হাদীসের উপর আমল করছাে। হে ফুক্বাহায়ে কেরামের দল! শুনে রাখাে! তামরা ডাক্তার। আর আমরা হলাম ফার্মাসিস্ট বা ভেষজবিজ্ঞানী। আর তুমি (আবূ হানীফা) এই উভয় দিককেই গ্রহণ করেছা। (আছারুল হাদীসিশ শারীফ; প. ১২২-১২৩)।
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হযরত যুফার রহ. ইমাম আ’যম আবুু হানীফা রহ. এর মাযহাব গ্রহণের কারণ হলা, একবার তিনি ও তার সঙ্গীদের কাছে একটি মাসআলার সমাধান বের করা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ালাে। ফলে তিনি ইমাম আবূ হানীফার কাছে আসলেন।
ইমাম সাহেব তার প্রশ্নের উত্তর দিলে হযরত যুফার তাক জিজ্ঞাসা করলেন, এটি আপনি কােত্থেক বললেন? ইমাম আবূ হানীফা রহ. বললেন, ওমুক হাদীস এবং এই এই কিয়াসের কারণে। অত:পর হযরত যুফারকে লক্ষ করে আবূ হানীফা রহ. বললেন,
মাসআলার সূরত এরকম হলে উত্তর কেমন হতাে? যুফার বললেন, এক্ষেত্রে তাে আমি আগের মাসআলার চেয়েও বেশী অন্ধ। তখন আবূ হানীফা রহ. তারও জবাব দিয়ে দিলেন। হযরত যুফার বলেন, এরপর তিনি আরাে একটি মাসআলা সমাধান আমাকে দিলেন।
এসব মাসআলা নিয়ে আমি আমার সঙ্গীদের কাছে ফিরে এলাম। তাদের কাছে এগুলাের সমাধান জানতে চাইলে দেখলাম, এ ব্যাপারে তারা আমার চেয়েও বেশী অন্ধ। তখন আমিই তাদেরকে এগুলাের জবাব শুনালাম এবং তার কারণও উল্লেখ করলাম। তারা বললাে, আপনি এসব কােথায় পেলেন?
আমি বললাম, আবূ হানীফার কাছ থেকে। ফলে এই তিন মাসআলার কারণে আমিই মজলিসের নেতা বনে গেলাম। এরপরই হযরত যুফার রহ. ইমাম আবূ হানীফার দিকে প্রত্যাবর্তন করলেন এমনকি হানাফী মাযহাবের বড় বড় দশজন ফক্বীহর মধ্য থেকে তিনিও একজন হলেন যারা ইমাম আ’যমের সাথে কিতাব সংকলনের কাজ করেছেন। ( ইমাম সাইমারী রহ. কৃত মানাকিবু আবী হানীফা; ১০৭)।
এরকম আরো অসংখ্য ঘটনা রয়েছে, যা আমরা জানিনা, পড়েও দেখিনা।সকলের কাছে অনুরোধ থাকবে আমরা প্রত্যেকেই যেন কিছু মুতালাআ করে এ বিষয়ের একটি এজমালি ইলম অর্জন করতে পারি। ইমামে ইমামে আজম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহ আলাই হির ফাজায়েল ও তার ওপর আরোপিত অপবাদের জবাব জানার জন্য-
নিম্নের কিতাবগুলো পড়া যেতে পারেঃ
১. ইবনু আবিল আওয়াম কৃত (৩৩৫ হি.) ফাযাইলু আবি হানীফা ওয়া আখবারুহু ওয়া মানাকিবুহু।
২. আবু আব্দুল্লাহ সাইমারি (৪৩৬ হি.) কৃত আখবারু আবি হানিফা ওয়া আসহাবুহু।
৩. ইবনে আবদিল বার (৪৬৩ হি.) কৃত আল ইন্তেকা ফি ফাযাইলিল আইম্মাতিস সালাসাতিল ফুকাহা।
৪. মুআফফাক মক্কী (৫৬৮ হি.) কৃত মানাকিবু আবি হানীফা।
৫. হাফেয যাহাবী শাফেয়ী রহ.(৭৪৮ হি.) কৃত মানাকিবু আবি হানীফা ওয়া সাহিবাইহি।
৬. মুহাম্মদ কারদারী (৮২৭ হি.) কৃত মানাকিবু আবি হানীফা
৭. হাফেয সুয়ূতী শাফেয়ী রহ. (৯১১ হি.) কৃত তাবয়ীযুস সহীফাহ্ ফি মানাকিবি আবি হানীফা।
৮. মুহাম্মদ বিন ইউসুফ সালেহী শাফেয়ী (৯৪২ হি.) কৃত উকুদুল জুমান ফি মানাকিবি আবি হানীফা নুমান।
৯. ইবনে হাজার মক্কী শাফেয়ী (৯৭৩ হি.) কৃত আল খাইরাতুল হিসান ফি মানাকিবিল ইমামিল আযম আবি হানীফা নুমান।
১০. শায়েখ যফর আহমদ উসমানী (১৩৯৪ হি.) কৃত আবু হানীফা ওয়া আসহাবুহুল মুহাদ্দিসুন।
১১. শায়েখ আব্দুর রশীদ নুমানী (১৪২০ হি.) কৃত মাকানাতু আবি হানীফা ফিল হাদিস।
১২. শায়েখ সরফরায খান সফদর কৃত মাকামে আবি হানীফা।
১৩. ডক্টর মুহাম্মদ কাসেম হারেসী কৃত মাকানাতু আবি হানীফা বাইনাল মুহাদ্দিসীন।
১৪. শায়খ আবু যুহরা কৃত আবু হানীফা হায়াতুহু ওয়া আসরুহু ওয়া ফিকহুহু ওয়া আরাউহু।
১৫. শায়েখ মুহাম্মদ আলী সিদ্দীকী কৃত ইমামে আযম আওর ইলমে হাদীস।
১৬. শায়েখ আব্দুশ শহীদ নুমানী কৃত ইমাম আবু হানীফা কি তাবিইয়্যাত আওর সাহাবা সে উনকি রেওয়ায়াত।
১৭. শায়েখ যাহেদ কাওসারী (১৩৭১ হি.) কৃত তানিবুল খতিব। অর্থাৎ, খতিব বাগদাদি রহ. ইমাম আবু হানীফা রহ. সম্পর্কে যেসব অপবাদ উল্লেখ করেছেন কিতাবটি তার খন্ডনে লেখা হয়েছে।
১৮. শায়েখ যাহেদ কাওসারী কৃত আন-নুকাতুত তরীফা। যা ইবনু আবি শাইবার খন্ডনে লেখা হয়েছে।
১৯. আবুল মুযাফফর ইসা ইবনুল মালিকিল আদিল সাইফুদ্দীন (৬২৪ হি.) কৃত আস সাহমুল মুসিব ফি কাবিদিল খতিব। যা খতিব বাগদাদির খন্ডনে লেখা হয়েছে।
২০. মাও. আব্দুল মালেক সাহেব দা. বা. কৃত আবু হানীফা আল মুফতারা আলাইহি। মাখতুত বা অপ্রকাশিত।
শেষটি বাদ দিয়ে বাকি সবগুলো কিতাবই এখন প্রকাশিত। এছাড়াও অসংখ্য কিতাব ইমাম আবু হানীফার মর্যাদা ও তাঁর স্বপক্ষে খন্ডনে লেখা হয়েছে। এখানে কেবল প্রকাশিত (শেষটি বাদ দিয়ে) ও প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহের তালিকাই পেশ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এই কিতাব সমূহ মুতালাআ করার তৌফিক্ব দান করুন। আমিন।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
do not share any link