গুম, হত্যা, জুলুম; একটি সমীক্ষা : 
গত কালকের কথা। রাস্তায় বেরুলাম। হঠাৎ দেখলাম, কয়েকজন দাড়িয়ে বিড় বিড় করছে। কাছে গেলাম। কথা প্রসঙ্গে তারা আমাকে বলল, আচ্ছা এই যে দেশে দেশে মুসলমানদের উপর এমন হত্যা, গুম আর নির্যাতন চলছে মুসলমানরা কিন্তু ইচ্ছা করলে এক যোগে এর প্রতিশোধ নিতে পারে।
 
শুধু হিম্মত আর সাহসের দরকার। দরকার মরণাপন্ন লড়াই। সাথে দরকার শহিদি তামান্না ও মওতের জযবা। আমি বললাম, কথাগুলোর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তো উলামায়ে কেরাম ভালো জানবেন। তবে আমি ইসলামী ইতিহাসের একটি সমীক্ষা পেশ করি। আগেই বলছি, আপনার বক্তব্য সম্পর্কে আমার কথা নেই। তা একমাত্র যোগ্য উলামায়ে কেরাম বিশ্লেষণ দিতে পারেন। আমি যা বলতে চাচ্ছি তা হলো :

ইসলামে উদারতার কিছু দৃষ্টান্ত : 
আপনাদদের জানা থাকা দরকার যে, ইয়ারমুকের যুদ্ধে হযরত খালেদ রা. এর হাতে কাফের সেনাপতি জর্জার মুসলমান হয়। যুদ্ধের ময়দানে জর্জার হযরত খালেদ রা. কে প্রশ্ন করলেন, কেউ মুসলমান না হলে আপনারা কি করেন? হযরত খালেদ রা. বললেন, টেক্স দিতে হবে এবং আমরা তার হেফাযতকারী হব। ফলে সে ইসলামের সৌন্দর্য দেখে মুসলমান হয়।

সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ্ কনস্টান্টি-নোপল জয় করে ঘোষণা দিলেন, অমুসলিমরা আগের মতই বসবাস করবে। তারা আমাদের ভাই। সুলতান আরসালান আরমেনিয়া জয় করে কাফের সেনাপতিকে বন্দি করে বললেন, আপনার বাইবেলেই আছে শত্রুকে ক্ষমা কর। তাই আপনাকে ক্ষমা করে দিলাম।

গাজী সালাহ্ উদ্দীন আইয়ুবী ইউরোপ যুদ্ধ করছিলেন। আর কিছুক্ষণ হলেই জয় করবেন। এমতাস্থায় জানতে পারলেন, খ্রীস্টান সেনাপতি বিচার্ড গুরুতর অসুস্থ। সালাহ্ উদ্দীন তখন হেকিমের ছদ্দবেশে তার চিকিৎসা করলেন এবং যুদ্ধ বন্ধ করলেন। বিচার্ড তখন আইয়ুবীকে জরিয়ে ধরল।

১১৮৭ ইং তে গাজী সালাহ্ উদ্দীন আইয়ুবির নেতৃত্বে জেরুজালেম দখল করা হয়। আর ক্রুসেডারদেরকে কিছু মুক্তি পণ নিয়ে এবং গরিবদেরকে বিনা মুক্তি পণে ছেড়ে দেয়া হয়। অথচ ১০৯৯ ইং ১৫ জুলাই বিকাল ৩টার সময় জেরুজালেম মুসলমানদের হাত ছাড়া হলে সকল মুসলমানকে পানিতে ডুবিয়ে কিংবা মসজিদে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

হযরত আলী রা. এর হত্যাকারী আব্দুর রহমান বিন মুলজিমকে ধরার পর হযরত আলী রা. হাসান রা. কে লক্ষ করে বলেন, সে এখন কয়েদী। তার আদর আপ্যায়নে যেন ত্রুটি না হয়। তার খাওয়ার জন্য ভালো খাবার এবং শোয়ার জন্য ভালো বিছানা দিবে।

উহুদ যুদ্ধে যখন রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কঠিন আহত হন তখন সাহাবীরা বদ দুআ' করতে বললেন। নবীজী তখন বললেন, 
إني لم أبعث لعانا ولكن بعثت داعيا و رحمة اللهم اهد قومي فإنهم لايعلمون
অর্থাৎ, আমি দুনিয়াতে অভিশাপ-কারীরুপে প্রেরিত হইনি। বরং আমি একজন দায়ী এবং রহমতের আঁধার। হে আল্লাহ্! আপনি আমার উম্মতকে হেদায়েত দান করুন। কারণ, তারা বুঝে না।

সারকথা : 
আমার কথার খুলাসা হলো, সব ক্ষেত্রে শুধু প্রতিবাদি হলে চলে না। শুধু প্রতিশোধ নিয়ে কেউ কখনো সফল হবে না। তাআল্লুক মাআল্লাহর সাথে সাথে প্রচুর পরিমাণে খিদমাতুল খালক প্রয়োজন। একজন আলেম কিংবা সাধারণ কোন মানুষ গুম হওয়ার অর্থ এটা নয় যে, আমরাও তাহলে সে পথ ধরব। কেউ জুলুম করলে সে তার ফল পাবে। কিন্তু তাই বলে তো আমিও জুলুম করতে পারি না।

উলামায়ে কেরাম নির্যাতিত হওয়ার অর্থ এটা নয় যে, কাল থেকে আমরাও কারো উপর নির্যাতন শুরু করব। হ্যাঁ, আমার যদি পরিপূর্ণ সামর্থ থাকে, শক্তি থাকে তাহলে প্রতিবাদ করব ইসলামের নীতিতে। জুলুম প্রতিহত করা তো অবশ্যই জরুরী। কিন্তু আমি প্রতিবাদি হলে যদি জন সাধারণের প্রাণ নাশের আশংকা হয়, আমি প্রতিবাদ করতে গিয়ে যদি নীরিহ মানুষ খতিগ্রস্থ হয় তাহলে ইসলাম তা কোনোভাবেই সাপোর্ট করে না।

যেমন ধরুন : আপনার পরিবারের কাউকে ডিবি পরিচয়ে কেউ তুলে নিয়ে গেল। এরপর থেকে সে গুম, নিখোজ। তার কোন হদিস নেই। এখন আপনি বললেন এদেশের পুলিশদের আর ছাড়  দেয়া যাবে না। এরপর আপনি সরকারি কর্মকর্তাদের যাকে সুযোগ পেলেন...........।

এটা সম্পূর্ণ হারাম। এই পদ্ধতি ইসলাম কোনোভাবেই সাপোর্ট করে না। হ্যাঁ, আপনি সরকারের কাছে দাবি জানাতে পারেন বা চাপ প্রয়োগ করতে পারেন তাকে খুজে বের করার জন্য। সর্বপরি সরকারি যে কোন পদক্ষেপ নিতে পারেন।
কিংবা নিজে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে তার তদন্ত ও বিচার করতে পারেন। আর এজন্য আপনার জনগণের সাপৌর্ট লাগবে। এগুলো কি করতে পারবেন আপনি? আপনি শরয়ী নীতিতে আসতে না পারলে যাকে ইচ্ছা হত্যার কথা বলবেন এটা কি করে হয়?

পরিশেষে :
সবশেষে আমি এটাই বলব, আসুন আমরা সকলে মিলে উদার ও নম্র হই। দুআ ও রুনাজারির প্রতি মনোনিবেশ করি। সঠিক কর্ম পন্থা শিখি ও কাজের মানসিকতা তৈরি করি। যে সকল মানুষ গুম হয়ে যাচ্ছে, নিখোজ হচ্ছে কিংবা গুপ্ত হত্যার শিকার হচ্ছে।
অথবা নির্যাতন আর নিপিরণের যাতাকলে পিষ্ট হচ্ছে- আসুন তাদের জন্য আমরা দআ করি। আল্লাহর কাছে আমাদের সকলের নিরাপত্তা কামনা করি। আর হ্যাঁ, শরয়ী এ'দাদ শিখি এবং তৈরি করি। আল্লাহ্ কবুল করুন। আমিন।

Post a Comment

do not share any link

নবীনতর পূর্বতন