হাদীস শাস্ত্রে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর অবদান (কিতাবুল আছার ইতিহাস, ঐতিহ্য, অবদান)

মুফতী সাঈদুর রহমান সিদ্দীক নাটোরী, খাদেমে দারুল ইফতা ও শিক্ষাসচিব- মারকাযুল উলূমিদ্ দ্বীনিয়্যাহ্ভেলানগর, (জেলখানার মোড়)নরসিংদীবাংলাদেশ

পর্ব- ২ কিতাবুল আছার হাদীসের সর্ব প্রথম কিতাব হওয়া নিয়ে আপত্ত্বি ও তার জবাবঃ

হাদীসের সর্ব প্রথম কিতাব কি মুআত্বা?

হায়াতে ইমাম মালেককিতাবে বলা হয়েছে, মুআত্ত্বা কিতাব ইসলামের সর্বপ্রথম কিতাবকাশফুয যুনূনকিতাবেও একই কথা উল্লেখিত হয়েছে। কাযী আবূ বকর ইবনুল আরাবী রহ. (মৃত. ৫৪৭ হি.) মুআত্ত্বার ব্যাখ্যা গ্রন্থেও তাই উল্লেখ করেছেনহযরত সুফিয়ান বলেন, সহীহর সর্বপ্রথম কিতাব হলো ইমাম মালেকের মুআত্ত্বা

ঐতিহাসিক ভাবে তা প্রমাণিত নয়। এ বিষয়ে তারা অনবগত থাকাটা স্বাভাবিক ঃ

জানা উচিৎ যে, ঐতিহাসিকভাবে তা প্রমাণিত নয়কারণ, কাশফুয যুনূনের ইবারত অনেক তালাশের পরও পাওয়া যায়নিআর সুফিয়ানের যে বক্তব্য নকল করা হয়েছে তার হাওয়ালা উল্লেখ করা হয়নি

মূলতঃ এই বক্তব্য সুফিয়ানের নয় বরং হাফেয মুগলতায়ীরঅবশ্য ইবনুল আরাবীর বক্তব্য কাশফুয যুনূনে উল্লেখ করা হয়েছেকিন্তু কাযী সাহেব যা বলেছেন তা নিজের জ্ঞান অনুযায়ী বলেছেন

কারণ, ‘কিতাবুল আছারসম্পর্কে জ্ঞান না থাকা কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়অনেক প্রসিদ্ধ কিতাব সম্পর্কেও দেখা যায় বড় বড় আলেমরা অনবগত ছিলেন। হাফেয আবূ সাঈদ আলায়ীর মন্তব্য হলো, হাফেয আবূ আলী নিশাপূরী রহ. সহীহ্ বুখারীসম্পর্কে অনবগত ছিলেনএমনিভাবে হাফেয ইবনে হাযামেরও জামেতিরমিযী ও সুনানে ইবনে মাজাহ্ সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না

দেখুন- ইমাম ইবনে মাজাহ্ আওর ইলমে হাদীস পৃ. ২৮৪-৮৫, আল-ইমাম ইবনু মাজাহ্ ওয়া কিতাবুহুস সুনান পৃ. ১৮৩, তাদরীবুর রাবী পৃ. ৬৫, প্রথম নাউ -২য় মাসআলা, ছালাছু রাসায়েল পৃ. ১৭০, আর-রফউ ওয়াত-তাকমীল পৃ. ২৯৬

এরকম ঘটনা ইমাম বাইহাকিরও ঘটেছে- আর-রফউ ওয়াত-তাকমীল পৃ. ৩০৫আরো দেখুন; মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের লিখিত আল-মাদখালপৃ. ১২২-১২৪সেখানে আছে, হাফেয ইবনুল জাওযী রহ. ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. কে চিনতেন না

সুতরাং যারা মুআত্ত্বাকে সর্বপ্রথম কিতাব বলেছেন, হয়তো তারা না জেনে বলেছেন কিংবা বলতে হবে, প্রত্যেকেই তার আগের ব্যক্তির অনুসরণ করেছেনবাস্তবতা উদ্ঘাটন করার প্রয়োজনবোধ করেননি

ইমাম আবু হানীফা রহ. মালেক রহ. এর কিতাব পড়তেন বিধায় কিতাবুল আছার লিখেছেন ঃ

এখানে এসে হাফেয ইবনু আবী হাতেম রহ. এমন কথা বলেছেন যে বিষয়ে তাকে মাযূর মনে করা দুস্করতিনি আল-জারহু ওয়াত-তাদীলকিতাবের ভূমিকায় বলেন, ‘ইমাম আবূ হানীফা রহ. মালেক ইবনে আনাসের কিতাবের উপর নযর রাখতেন

অথচ হাফেয ইবনু আবিল আওয়াম রহ. ফাযাইলু আবী হানীফাপৃ. ২৩৫ কিতাবে সনদসহ উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম মালেক রহ. ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর কিতাবসমূহ মুতালাআকরতেন এবং তা থেকে উপকৃত হতেন

এমনকি ইমাম মালেক রহ. বলেন, আমার কাছে ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর ফিক্হ থেকে ষাট হাজার মাস্আলা রয়েছে। -(তানীবুল খতীব পৃ. ৯)। তাছাড়া ইবনু আবী হাতেমের এই বক্তব্যের কোন সনদ নেই এবং কোন দলীলও নেইসুতরাং তার কথার কোনই গ্রহণযোগ্যতা নেই

দেখুন- ইমাম আবূ হানীফা রহ. ইমাম মালেক রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন কি না- বিস্তারিত দেখুন : ইমাম ইবনে মাজাহ্ আওর ইলমে হাদীসপৃ. ২৬২-২৬৫, ‘আল-ইন্তিকাপৃ. ৪১-৪৪

আসল কথা হলো, ইমাম আবু হানীফা রহ. এর জীবদ্দশায় মুআত্বা লেখাই হয়নি ঃ

আসল কথা হলো, ইমাম মালেক রহ মুআত্ত্বালিখা সমাপ্ত করেছেন ইমাম আবূ হানীফার ইন্তেকালের পরকারণ, পৃথিবীতে ইমাম মালেকের ইলমী মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৪৬ হিজরীর পর

আর আল্লামা সুয়ূতীর বক্তব্য (তারীখুল খুলাফা) অনুযায়ী ১৪৩ হিজরীর পরআর এর পরে ইমাম আবূ হানীফা ও মালেক রহ. এর এক সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে কোন  তথ্য পাওয়া যায় না

আরো মজার বিষয় হলো, হাফেয ইবনে হাযাম রহ. বলেছেন, ইমাম মালেক রহ. মুআত্ত্বা সংকলন করেছেন ইয়াহ্ইয়া ইবনে সাঈদ আনসারীর ইন্তেকালের পর। ইমাম মালেকের শাগরিদ হাফেয আবূ মুস্আব বলেন, আব্বাসী খলীফা মানসূর এর নির্দেশে ইমাম মালেক কিতাব লেখা শুরু করেন

কিতাব লেখা সম্পন্ন হয় খলীফা মানসূরের ইন্তেকালের পরআর খলীফা ইন্তেকাল করেন ১৫৮ হিজরীতেএদিকে ইমাম আবূ হানীফার ইন্তেকাল হয়ে যায় ১৫০ হিজরীতে। তাহলে কিভাবে মুআত্ত্বা কিতাব সর্বপ্রথম সংকলন হয়?  

আর কিভাবেই বা ইমাম আবূ হানীফা ইমাম মালেকের কিতাব মুতালাআকরতেন? সুতরাং ঐতিহাসিকভাবেও এটা প্রমাণিত যে, কিতাবুুল আছারই হাদীস শাস্ত্রের সর্বপ্রথম কিতাবএতে কারোরই কোন প্রকার সন্দেহ থাকার কথা নয়

দেখুন- আল্লামা কাওছাকৃত আল-ফিক্বহ্ ওয়া উসূলুল ফিক্বহ পৃ. ২১৩, ‘ইমাম ইবনে মাজাহ্ আওর ইলমে হাদীসপৃ. ২৯৪-২৯৫, ‘আল-ইন্তিকাপৃ. ৮১, ‘মুকাদ্দিমাতুশ শাইখ আব্দিল ফাত্তাহ্ আলাত্তালীকিল মুমাজ্জাদপৃ. ১/১০-১২ দারুল কলম ১৪২৬ হি.

কিতাবুল আছারে আছার আছে তাহলে তা হাদীসের কিতাব হয় কি করে?

অনেকেই মনে করতে পারেন কিতাবুল আছারে তো সাহাবা-তাবেঈনের ফিক্হ-ফতোয়া ও আছার সংকলিত হয়েছে। সুতরাং তা হাদীসের কিতাব হয় কি করে? তো এক্ষেত্রে আমার প্রথম কথা হচ্ছে, ইমাম মালেক রহ. রচিত আল-মুআত্ত্বাকিতাব যদি সাহাব-তাবেঈনের আছার সম্বলিত হওয়ার পরও হাদীসের কিতাব হতে পারে,

ইমাম বুখারীর সহীহ্ বুখারীর তালীকাত ও তরজমাতুল বাবে সাহাবা-তাবেঈর আছার উল্লেখিত হওয়া সত্ত্বেও যদি তা হাদীসের কিতাব হতে পারে তাহলে কিতাবুল আছারহাদীসের কিতাব হতে সমস্যা কোথায়?

আগামী পর্বে পড়ুন- দু‘শ হিজরীর আগের ও পরের মানহাজ কি? বিস্তারিত দলীল সমৃদ্ধ আলোচনা।

যদি কেউ লেখা পাঠাতে চান তাহলে যোগাযোগ করতে পারেন এই ঠিকানায়-annasihah91@gmail.com

১ম পর্ব পড়তে এখানে নিচে ক্লিক করুন-

হাদীস শাস্ত্রে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর অবদান- কিতাবুল আছার ইতিহাস, ঐতিহ্য, অবদান

ধন্যবাদ সবাইকে কমেন্ট ও শেয়ার করার জন্য।

Post a Comment

do not share any link

নবীনতর পূর্বতন