হাদীস শাস্ত্রে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর অবদান (কিতাবুল আছার ইতিহাস, ঐতিহ্য, অবদান)
মুফতী সাঈদুর রহমান সিদ্দীক নাটোরী, খাদেমে দারুল ইফতা ও শিক্ষাসচিব- মারকাযুল উলূমিদ্ দ্বীনিয়্যাহ্, ভেলানগর, (জেলখানার মোড়), নরসিংদী, বাংলাদেশ।
পর্ব-৩ দু‘শ হিজরীর আগের ও পরের মানহাজের পার্থক্য; একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ :
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আমাদেরকে দু‘শ হিজরীর আগের ও পরের মানহাজ ভালো করে বুঝতে হবে। তা না হলে এরকম যেটা আমরা পুর্বে বলে আসছিলাম যে, কেউ বলতে পারেন কিতাবুল আছারে তো অসংখ্য আছার রয়েছে তাহলে তা হাদীসের কিতাব হয় কি করে?- অসংখ্য বিষয়ে আমাদের বিভ্রান্ত হতে হবে।
হাদীসের প্রকার নিয়ে পার্থক্য ঃ
যেমন ধরুন, দু’শ হিজরীর আগে হাদীসের এতো প্রকার ছিল না। বরং সহীহ্ হাদীস তাকেই বলা হত যা মা’মূলবিহী’। আল্লামা সালেহ্ বিন মাহ্দী মাকবিলী রহ. বলেন, ‘ইমাম বুখারী ও মুসলিমের যামানা থেকে মুতাআখ্খিরীন উলমায়ে কেরামের কাছে সহীহ্ হাদীস হলো,
বর্ণনাকারী সকলে হাফেয আদেল হওয়া এবং হাদীসটি শায ও ইল্লতযুক্ত না হওয়া। অথচ মুতাকাদ্দিমীন ফুক্বাহা ও মুহাদ্দিসীন সকলের কাছেই সহীহ্ হাদীস হলো, যা মা‘মূলবিহী (তথা যার উপর আমল রয়েছে)। (আল-আজবিবাতুল ফাযিলাহ্ পৃ. ২৩২-২৩৩)।
এ হিসেবে কোন হাদীসের সনদ সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহীহ্ হলেও তা যদি মানসূখ হয় বা মা’মূলবিহী না হয় তাহলে মুতাকাদ্দিমীন উলামায়ে কেরাম তাকে সহীহ্ বলতেন না। অপরদিকে হাদীসটি মুরসাল, মুনকাতে’ হওয়ার পর তা মা’মূলবিহী হলে তারা তাকে সহীহ্ গণ্য করতেন।
অথচ মুতাআখ্খিরীনের কাছে এমন মুরসাল দুর্বল হাদীসের প্রকার। এখন যদি পরবর্তীদের এই মানহাজ দিয়ে পূর্ববর্তীদের হাদীসের উপর দুর্বলের হুকুম লাগানো হয় তাহলে কত বড় মারাত্নক ভুল হবে তা বলাই বাহুল্য।
এ সম্পর্কে একটি ঘটনা ঃ
প্রসঙ্গত এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যথাযথ মনে করছি। হযরত সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. বলেন, একবার ইমাম আওযায়ী ও আবূ হানীফা মক্কায় একত্র হলেন। তখন আওযায়ী রহ. ইমাম আবূ হানীফাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা! আপনারা নামাযে রুকূতে যাওয়ার সময় এবং রুকূ থেকে উঠার সময় ‘রফে ইয়াদাইন’ করেন না কেন?
ইমাম আবূ হানীফা রহ. বললেন, কারণ এক্ষেত্রে রাসূলের কোন সহীহ্ হাদীস নেই। আওযায়ী রহ. বললেন, কেন? হাদীসটি তো আমার কাছে যুহরী, সালেম থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি রাসূল থেকে বর্ণনা করেছেন।
ইমাম আবূ হানীফা রহ. বললেন, আমার কাছেও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ, তিনি ইবরাহীম থেকে, তিনি আলকামা ও আসওয়াদ থেকে, তারা ইবনে মাসঊদ থেকে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে,
তিনি কেবল নামাযের শুরুতে হাত উঠাতেন, এছাড়া আর অন্য কোথাও হাত উঠাতেন না। হযরত আওযায়ী রহ. বললেন, আমি আপনাকে যুহরীর সনদ দেখাচ্ছি আর আপনি বলছেন হাম্মাদের সনদের কথা!?
তখন আবূ হানীফা রহ. বললেন, জনাব! যুহরী থেকে হাম্মাদ বড় ফক্বীহ এবং ইবরাহীম সালেম থেকে বড় ফক্বীহ্। আর আলক্বামা ফিক্বহের ক্ষেত্রে ইবনে উমরের থেকে ছোট নয়। ইবনে উমর যদিও একজন সাহাবী তবে আলকামারও রয়েছে সোহবতের ফযীলত।
আর ইবনে মাসঊদ তো ইবনে মাসউদ! একথা শুনে আওযায়ী রহ. চুপ হয়ে গেলেন। দেখুন- আল্লামা খাসকাফী রহ. বর্ণিত ‘মুসনাদে আবী হানীফা’ পৃ. ৪২০-৪৩৮ মাকতাবাতুল বুশরা, এরকম আরেকটি ঘটনা দেখুন : ‘সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা’, ৭/১১২-১১৩।
লক্ষ করার বিষয় হলো, ইমাম আবূ হানীফা রহ. ইমাম আওযায়ীর হাদীসকে গাইরে সহীহ্ বলেছেন। কারণ, তিনি কূফাতে সাহাবা-তাবেঈর আমল দেখেছেন। কিন্তু আওযায়ী রহ. যখন সনদের বিষয়টি গুরুত্ত্বের সাথে উল্লেখ করলেন তখন ইমাম আবূ হানীফা রহ. বললেন, সনদ আমারটা এরচেয়েও বেশি শক্তিশালী।
হাদীসের পিরীতে তাআ‘মুল ঃ
এমনিভাবে সালাফের কাছে কোন বিষয়ের তাআ’মুল গ্রহণীয়। অর্থাৎ যদি কোন বিষয়ে সাহাবা-তাবেঈর আমল পাওয়া যায় তবে তাই দলীল হিসেবে যথেষ্ট। যদিও এক্ষেত্রে সনদের বিচারে সহীহ্ সনদের কোন হাদীস না পাওয়া যায়।
শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. বলেন, ‘কোন বিষয়ে সালাফের ঐক্যমত ও তাআ’মুল ফিক্হের অনেক বড় একটি মূলনীতি’। ইমাম আবূ দাঊদ রহ. বলেন, ‘দু’টি হাদীস পরষ্পর বিরোধী হলে সাহাবীদের আমল যা হবে তাই গ্রহণ করতে হবে’।
ইমাম মালেক রহ. বলেন, ‘পরস্পর বিরোধী দু’টি হাদীসের একটিতে যদি আবূ বকর ও উমর রা. আমল করে অপরটি পরিত্যাগ করে থাকে তবে এটাই একথার দলীল যে, তাদের আমলকৃত হাদীসটিই সঠিক’।
আল্লামা ইবনুল হুমাম রহ. বলেন, ‘উলামায়ে কেরামের আমলই হাদীসকে সহীহ্ বানিয়ে দেয়’। আলোচনা অনেক দীর্ঘ। বিস্তারিত দেখুন: ‘আল-ইমাম ইবনু মাজাহ্ ওয়া কিতাবুহুস-সুনান’ পৃ. ৮৪-৯০ এবং ‘আছারুল হাদীসিস শরীফ’ পৃ. ৮৮-৯৫।
একটি দৃষ্টান্ত: তারাবীর রাকাত সংখ্যা কত?
যেমন : তারাবীর রাকাত সংখ্যা বিশ। এক্ষেত্রে বিশ রাকাতের স্বপক্ষে হাদীসের যে উদ্ধৃতি দেওয়া হয় তা সনদের বিচারে কিছুটা দুর্বল হলেও তাতে কোন আপত্তি নেই। কারণ, খলীফা উমরের যুগ থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত মক্কা মদিনায় বিশ রাকাত তারাবীহ্ হচ্ছে।
এই আমলটিই সর্বোচ্চ পর্য়ায়ের দলীল হওয়ার জন্য যথেষ্ট। এখন যদি বলা হয়, হাদীসটি সনদের বিচারে দুর্বল তাই এর উপর আমল করা যাবে না তাহলে এটা হবে পরবর্তী মানহাজ দিয়ে পূর্ববর্তীদের মানহাজের উপর হামলা করা।
কারণ, সাহাবা-তাবেঈদের আমলই তো হাদীসটিকে বিশুদ্ধতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে পৌঁছায়। দুর্বলতা তো এসেছে পরবর্তী বর্ণনাকারীদের বিবেচনায়। সে যুগের উলামায়ে কেরাম, মুহাদ্দিসীনেকেরাম, ফুক্বাহায়ে কেরাম, কারো কাছেই তো তা দুর্বল ছিল না।
এখন আপনি পরবর্তী পারিভাষিক দুর্বলকে আগের পারিভাষিক সহীহ্ হাদীসের উপর চাপিয়ে দিবেন এটা তো হয় না। কারণ, তাদের কাছে তো মা’মূলবিহী হওয়াটাই হাদীস সহীহ্ হওয়ার দলীল।
হাফেয সুয়ূতী রহ. বলেন, ‘উলামায়ে কেরাম যে হাদীসকে আমল হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছেন বা মুহাদ্দিসীনে কেরামের কাছে তা একটি প্রসিদ্ধ হাদীস তবে তা মাকবূল (গ্রহণীয়) হিসেবে গণ্য। যদিও তার সহীহ্ কোন সনদ না থাকে’। (আল-আজবিবাতুল ফাযিলাহ্ পৃ. ২২৯ এ দৃষ্টিকোন থেকেও বিশ রাকাত তারাবীর হাদীসটি সহীহ্।
সারকথা হলো ঃ
পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের মানহাজ বুঝা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যা আমাদেরকে খুব ভালো করে বুঝতে হবে। হাদীস সহীহ্ যয়ীফ হওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেকের উসূল ও মানহাজ ভিন্ন ভিন্ন। তাই এক যুগের মানহাজ অনুযায়ী নির্ণিত সহীহ্ হাদীসকে অপর যুগের মানহাজ অনুযায়ী দুর্বল প্রমাণ করার চেষ্টা করা যাবে না।
সালাফের যুগে হাসান হাদীসের কোন অস্তিত্ত্ব ছিল না ঃ
বিষয়টি আরেকটু স্পষ্ট করার জন্য বলছি, সালাফের যুগে হাদীসের হাসান বলতে কোন প্রকার ছিলনা। ছিল কেবল সহীহ্ ও যয়ীফ। হাসানের সংগা ও হুকুম পরবর্তীদের তৈরী। -দেখুন: সিয়ারু আ’লামিন নুবালা; ইমাম আবূ দাঊদ রহ. এর জীবনী পৃ. ১৩/২১৪
তো এখন যদি কোন পরষ্পর বিরোধী দুই হাদীসের মধ্যে প্রাধান্যতা বর্ণনা করতে গিয়ে সালাফের বর্ণিত হাদীসকে এই বলে উড়িয়ে দেওয়া হয় যে, তা হাসান আর আমাদেরটা সহীহ্, তবে তা হবে মারাত্নক বোকামি। কারণ, সে যুগে তো হাসান বলতে কোন কিছুর অস্তিত্বই ছিল না। তারপরও সেটাকে হাসান বলা কি মূর্খ্যতা নয়? উপরন্তু যেখানে এমন অজুহাতে সে হাদীসকে পরিত্যাগ করা হচ্ছে!!
কিতাবুল আছারে, আছারে সাহাবা বা আছারে তাবেঈন থাকাটাও কেবল আগের ও পরের মানহাজের পার্থক্য ঃ
এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। ঠিক একই রকম সালাফের যুগে সাহাবা তাবেঈর আছার ও ফাতাওয়াকে হাদীস হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু পরবর্তী যুগে এগুলোকে হাদীস হিসেবে গণ্য করা হয় না।
তাই একথা বলা নিতান্তই মূর্খ্যতা যে, কিতাবুল আছারে সাহাবা তাবেঈর আছার ও ফাতাওয়া থাকায় তা হাদীসের কিতাব নয়। কারণ সেই যুগে তো এগুলোকে হাদীস হিসেবে গণ্য করা হতো তাই এগুলো হাদীসের কিতাবে স্থান পেয়েছে।
এখন এই অজুহাতে যদি কিতাবুল আছারকে হাদীসের কিতাব থেকে বাদ দেওয়া হয় তাহলে এটা হবে পরবর্তী মানহাজ দিয়ে পূর্ববর্তী মানহাজের উপর হামলা করা। যা হবে সুস্পষ্ট জুলুম ও চূড়ান্ত পর্যায়ের বোকামী। (ইবনে মাজাহ্ আওর ইলমে হাদীস ৮৪ ও ২৬৬।)
আগামী পর্বে পড়ুন- মুরসাল হাদীস নিয়ে দু‘শ হিজরীর আগের ও পরের পার্থক্য এবং কেন কিতাবুল আছারে মুরসাল হাদীস স্থান পেয়েছে। এবং কিতাবুল আছারের সবগুলো হাদীস কি সহীহ্? মুরসাল কি সহীহ্ হাদীস?
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
do not share any link