হাদীস শাস্ত্রে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর অবদান (কিতাবুল আছার ইতিহাস, ঐতিহ্য, অবদান)
মুফতী সাঈদুর রহমান সিদ্দীক নাটোরী, খাদেমে দারুল ইফতা ও শিক্ষাসচিব- মারকাযুল উলূমিদ্ দ্বীনিয়্যাহ্, ভেলানগর, (জেলখানার মোড়), নরসিংদী, বাংলাদেশ।
পর্ব ৪- হাদীসে মুরসাল, দু‘শ হিজরীর আগের ও পরের মানহাজের পার্থক্যঃ
এরকমই আরেকটি বিষয় হচ্ছে, হাদীসে মুরসাল বা মুরসাল হাদীস। সালাফের যুগে মুরসাল হাদীস একটি মযবূত দলীল ছিল। মুরসাল এটি দুর্বল হাদীসের প্রকার ছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে মানহাজের পরিবর্তন ঘটেছে।মুহাদ্দিসীনে কেরামের কাছে মুরসাল হাদীস দুর্বল হাদীসের প্রকার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
মুরসাল হাদীস গ্রহণীয় হওয়া না হওয়া নিয়ে বিস্তারিত ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা নিম্নের কিতাবগুলোতে দেখা যেতে পারে। ‘ছালাছু রাসায়েল ফি উলূমিল হাদীস’ পৃ. ৩২ ও ১৬৩-১৬৪, ‘ফিক্বহু আহলিল ইরাক ওয়া হাদীছুহুম’ পৃ. ৪৫-৪৬ ও ৪৮, ‘তাবসিরাহ্ বর মাদখাল’ পৃ. ৮৯-১০৩, মাও. আব্দুল মালেক সাহেব দা. কৃত ‘আল-ওয়াজিয’ পৃ. ৪৪-৪৬। অপ্রকাশিত,
আরো পড়ুন- কিতাব প্রেমিকদের কথা
'আছারুল হাদীছিস শারীফ’ পৃ. ৩০-৩১, ‘ইবনে মাজাহ্ আওর ইলমে হাদীস’ পৃ. ৩১৮-৩২০, মাও. আব্দুল মালেক সাহেব দা. বা. লিখিত ‘আল-মাদখাল’ পৃ. ১০৫-১১৬, ‘জামিউত-তাহ্সীল ফি আহ্কামিল মারাসিল’ নামক প্রসিদ্ধ কিতাব, ‘দিরাসাত ফী উসূলিল হাদীস আলা মানহাজিল হানাফিয়্যাহ্’ পৃ. ৩৭৩-৪০২, ‘মুকাদ্দিমাতু ইবনুস সালাহ্’ পৃ. ৮৩-৮৮ এবং তার সহযোগী ব্যখ্যাগ্রন্থসমূহ।
আমি সংক্ষিপ্তাকারে এখানে মুরসালের কিছু বিবরণ উপরোল্লিখিত কিতাব সমূহ থেকে তুলে ধরছি ঃ
ইমাম আবূ দাঊদ রহ. বলেন, ‘সালাফের যুগে উলামায়েকেরাম মুরসাল হাদীসকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করতেন। যেমন : সুফিয়ান ছাওরী, মালেক, আওযায়ী। পরবর্তীতে ইমাম শাফেয়ী রহ. এসে মুরসাল সম্পর্কে কথা বললেন, আর ইমাম আহমদ রহ. তাঁর অনুসরণ করলেন।
যদি মুরসালের বিপরীত কোন মুসনাদ না পওয়া যায় তবে মুরসাল হাদীসই গ্রহণযোগ্য। তবে তা মুসনাদ এর স্তরের নয়’। অবশ্য আল্লামা ইবনুল কাইয়িম, নববী, ইবনে কাছীর সহ আরো অনেকেই বলেছেন, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. মুরসাল হাদীসকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেন।
আরো পড়ুন- মোবাইলে বিবাহ কি বৈধ?
হাফেয ইবনে হাজার রহ. বলেন, ইমাম আহমদ থেকে প্রসিদ্ধ বর্ণনা হলো, তিনি মুরসাল হাদীস দলীল হিসেবে গ্রহণ করেন। হাফেয ইবনে রজব হাম্বলী রহ. বলেন, ইমাম আহমদ রহ. ঐ ব্যক্তির মুরসালকে দুর্বল মনে করেন, যে অনির্ভরযোগ্য ব্যক্তি থেকে গ্রহণ করে। আসল কথা হলো, ইমাম আহমদের কাছে মুরসাল হাদীস দুর্বলের একটি প্রকার।
কিন্তু তিনি আবার দুর্বল হাদীসই গ্রহণ করে থাকেন যদি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়েকেরাম থেকে তার বিপরীত কিছু না পাওয়া যায়। হাফেয ইবনে জারীর তবারী রহ. বলেন, ‘একচেটিয়া মুরসালকে দলীল না মানা একটি বেদআ’ত। যা দু’শ হিজরীর পরে উদ্ভাবিত হয়েছে’।
আল্লামা ইবনু আব্দিল বার রহ. বলেন, ‘যে সকল বর্ণনাকারীগণ কেবল নির্ভরযোগ্য রাবীদের থেকেই বর্ণনা করে থাকেন তাদের ‘মুদাল্লাস’ ও ‘মুরসাল’ গ্রহণযোগ্য’। (ছালাছু রাসায়েল।) হাফেয ইবনে জারীর তবারী রহ. বলেন, ‘তাবেঈদের সকলেই মুরসাল হাদীস গ্রহণের ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন।
দু’শ হিজরী পর্যন্ত কেউ তার বিরোধিতা করেনি’। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. ‘বলেন, কখনো কখনো মুরসাল হাদীস মুসনাদ থেকেও শক্তিশালী হয়’। হাফেয ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, ‘মুরসাল নিয়ে উলামায়েকেরামের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। এখানে সঠিক কথা হলো, মুরসাল হাদীসের কিছু আছে গ্রহণীয় আর কিছু আছে বর্জনীয়। আবার কিছু আছে ‘মউকূফ’।
যে সকল রাবীদের সম্পর্কে জানা যায় যে, তারা কেবল নির্ভরযোগ্য রাবীদের থেকে বর্ণনা করে তাদের মুরসাল গ্রহণযোগ্য। আর যারা ‘ছেকা‘ ‘গাইরে ছেকা’ সকলের কাছ থেকে বর্ণনা করে তাদের মুরসাল মউকূফ। কোন মুরসাল হাদীস নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের বর্ণিত হাদীসের বিরোধী হলে তা প্রত্যাখ্যাত’।
আসলে সালাফের যুগে মুসনাদ, মুরসাল, সহীহ্, হাসান বলতে হাদীসের প্রকারে কোন পার্থক্য ছিলো না। সবগুলোই তাদের কাছে গ্রহণীয় ছিল। (ইবনে মাজাহ্ আওর ইলমে হাদীস) মুল্লা আলী কারী রহ. বলেন, ‘মুরসাল জমহুর উলামায়েকেরামের কাছে গ্রহণীয় আর ফযীলতের ক্ষেত্রে সকলের কাছেই গ্রহণীয়’। (মেরকাত; হাদীস নং ৪২৮২)
আরো পড়ুন- হানাফীদের গোড়ার কথা
ইমাম শাফেয়ী রহ. কিছু শর্তের ভিত্তিতে মুরসাল হাদীস গ্রহণ করেন। যথা: (ক) ঐ হাদীসটিই দ্বিতীয় কোন সনদে বর্ণিত হওয়া কিংবা তার সমর্থবোধক হাদীস অন্য সুত্রে বর্ণিত হওয়া।
(খ) অন্য তাবেঈ থেকে অনুরুপ মুরসাল বর্ণিত হওয়া। (গ) অথবা অনুরুপ কোন সাহাবীর ফতোয়া পাওয়া যাওয়া। (ঘ) কিংবা অধিকাংশ উলামায়েকেরাম এর উপর ফতোয়া দেওয়া। (ছালাছু রাসায়েল)
আসল কথা হলো, খাইরুল কুরুনের যুগে এমন মুরসাল পাওয়া দুস্কর যার সনদ নেই। বরং তাঁরা একাধিক সনদ থাকলেই মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করে দিতেন। কারণ, সনদ তো অনেক। কয়টা বর্ণনা করবে। তাই সব সনদ বাদ দিয়ে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করে দিতেন।
হযরত সুলাইমান আ’মাশ রহ. বলেন, (শরহু মাআনিল আছার ১/১৬৪) একবার আমি ইবরাহীম নাখয়ীকে বললাম, ইবনে মাসউদ থেকে আমাকে সনদসহ বর্ণনা করুন। তখন তিনি বললেন, আমি তো তাঁর থেকে সনদ তখনই বলি যখন আমার কাছে কেবল ঐ সনদটিই থাকে। আর যখন বলি, ‘আব্দুল্লাহ্ বলেছেন’ তখন তার অর্থ হলো, তাঁর থেকে অসংখ্য বর্ণনাকারী হাদীসটি বর্ণনা করেছে।
একবার হাসান বসরীকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি হাদীস বর্ণনার সময় সনদ বললে আমাদের খুব ভালো হতো। উত্তরে তিনি বললেন, ‘এই বেটা! আমরা মিথ্যা বলিনা এবং মিথ্যা বলতেও পারি না। এখানে বিষয়টা হলো, খোরাসানের যুদ্ধের সময় তিন শত সাহাবী ছিলেন আমি কয়জনের নাম নেব।
আরো পড়ুন- আলবানীর এপিঠ ওপিঠ
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সেই খাইরুল কুরুন যুগের মুরসালের উপর আপত্তি উঠিয়ে কিতাবুল আছারের হাদীসের ক্ষেত্রে বলা হয় তা দুর্বল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইমাম বুখারীর তা’লীকাতগুলো নির্দিধায় গ্রহণ করা হয় আর খাইরুল কুরুন যুগের মুরসালকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। এটা কেমন ইনসাফ?
আচ্ছা! ইবরাহীম নাখয়ী, হাসান বসরীর মুরসাল বর্ণনা কি ইমাম বুখারীর তা’লীকাত থেকেও নিম্নস্তরের হয়ে গেলো! (তাবসিরাহ্ বর মাদখাল) হাফেয মুগলতায়ী রহ. বলেন, ‘সহীহ্ হাদীস তো তাই যার উৎস রয়েছে’। (ইসলাহু ইবনিস সালাহ্ পৃ. ৭৯-৮০) আর কিতাবুল আছারে এমন কোন হাদীস নেই যার কোন সহীহ্ উৎস নেই।
কিতাবুল আছারে কোন যয়ীফ হাদীস নেই ঃ
এজন্যই আল্লামা আব্দুর রশীদ নু’মানী রহ. বলেছেন, ‘আমরা এক এক করে কিতাবুল আছারের সকল রাবীকে পরখ করে অত্যন্ত বলিষ্ঠভাষায় একথা বলছি যে, কিতাবুল আছারে বর্ণিত হাদীসগুলো সহীহ্।
এতে এমন কোন বর্ণনা নেই যা জাল কিংবা দলীল হিসেবে অগ্রহণযোগ্য। এমনকি সকল মুরসাল হাদীসেরও সহীহ্ উৎস রয়েছে। তাই তা সহীহ্ হাদীসের কিতাব এতে কোন সন্দেহ নেই’। (তাবসিরাহ্ পৃ. ৫২)।
সহীহ্ বুখারীই সহীহ্ হাদীসের সর্ব প্রথম কিতাব বলাটা মারাত্নক ভুল ঃ
সুতরাং সহীহ্ বুখারীই হাদীসের সর্বপ্রথম সহীহ্ এর কিতাব বলাটা মারত্নক ভুল। কারণ, তার আগে কিতাবুল আছার ও ইমাম মালেকের মুআত্ত্বা রচিত হয়েছে। বরং তারও আগে রচিত হয়েছে সহীফায়ে আমর ইবনে হাযাম।
হাফেয ইয়াকুব ইবনে সুফিয়ান রহ. বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে হাদীসের সবচেয়ে বিশুদ্ধ সহীহ্র কিতাব হলো, আমর ইবনে হাযামের কিতাব। (আল-ইমাম ইবনু মাজাহ্ ওয়া কিতাবুহুস সুনান পৃ. ৭৮)।
কিন্তু তা ছিল অবিন্যস্ত এবং ব্যক্তিগত বিশেষ একটি সংকলন। তাই কিতাবুল আছারকেই সহীহ্ হাদীসের সর্বপ্রথম সংকলন বলতে হবে। সুতরাং কেবল সহীহ্ বুখারীকেই সহীহ্ এর কিতাব বলা এবং হাদীসের সর্বপ্রথম কিতাব বলা মূর্খ্যতা বৈকি!
জগতে ইমাম বুখারী ও মুসলিমের জন্ম না হলে কি দ্বীনের কোন খতি হয়ে যেত?
এজন্যই হাফেয ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেছেন, জগতে ইমাম বুখারী ও মুসলিমের জন্ম না হলে দ্বীনের কোনই খতি হতো না। (মাবাদিউ ইলমিল হাদীস পৃ. ৬১২)। কারণ, হাদীস তো এজন্য সহীহ্ হয়ে যায়নি যে, তা বুখারী মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। বরং হাদীস আগে থেকেই সহীহ্ আছে বিধায় তাঁরা তাদের কিতাবদ্বয়ে তা বর্ণনা করেছেন।
হাদীস বিশুদ্ধতার মাপকাঠি ও মূলনীতি আগেও ছিল এবং সে অনুযায়ী কিতাবও রচিত হয়েছে। (মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব কৃত তানকীহুল ফিক্র পৃ. ১৩২ অপ্রকাশিত)। আল্লামা ইবনু আমীরিল হাজ রহ. বলেন, ‘সহীহ্ বুখারী মুসলিমের হাদীসগুলো সর্বাধিক বিশুদ্ধ হওয়া এটা পরবর্তী প্রজন্মের দিকে লক্ষ করে। সালাফের সাথে তুলনা করে নয়।
পড়ুন- মাও. আব্দুল মালেক সাহেবের জীবনী
কিন্তু এক্ষেত্রে অনেকেই ভুল করে থাকে’। শায়েখ যাহেদ কাওছারী রহ. বলেন, সহীহ্ বুখারী-মুসলিম সহ হাদীসের ছয় কিতাবের দিকে উম্মতের মুখাপেক্ষি হওয়া এটা মুতাআখ্খিরীনদের দিকে লক্ষ করে। নতুবা মুতাকাদ্দিমীনদের কাছে অগণিত ও অসংখ্য সহীহ্ হাদীসের ভান্ডার ছিল। বরং তারাই হাদীস সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানতেন। (কাওয়ায়েদ ফি উলূমিল হাদীস পৃ. ৬৪-৬৫)।
আলোচনার সারাংশ, কিতাবুল আছারই সহীহ্ হাদীসের সর্ব প্রথম কিতাব ঃ
এতক্ষণের আলোচনায় আমাদের কাছে দিবালোকের ন্যায় একথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, ইমামে আ‘যম আবূ হানীফা রহ. হাদীসের প্রথম সংকলকারী এবং তাঁর রচিত ‘কিতাবুল আছার’ই সহীহ্ হাদীসের সর্বপ্রথম সংকলিত কিতাব। এক্ষেত্রে ইমাম মালেক রহ. সহ অন্যান্যরা তাঁর অনুসরণকারী ও অনুগামী।
আগামী পর্বে পড়ুন- ইমাম আবু হানীফা রহ. এর দিকে কিতাবুল আছারের সম্বন্ধ কি সহীহ্?
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
do not share any link