হাদীস শাস্ত্রে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর অবদান (কিতাবুল আছার ইতিহাস, ঐতিহ্য, অবদান)

মুফতী সাঈদুর রহমান সিদ্দীক নাটোরী, খাদেমে দারুল ইফতা ও শিক্ষাসচিব- মারকাযুল উলূমিদ্ দ্বীনিয়্যাহ্ভেলানগর, (জেলখানার মোড়)নরসিংদীবাংলাদেশ 

পর্ব-৫ -ইমামে আযম আবূ হানীফা রহ. এর দিকে কিতাবুল আছারএর সম্বন্ধ কি সহীহ্?

আল্লামা কাসানী রহ. বাদাইউস সানায়েকিতাবে (১/২২০) কিতাবুল আছারের নাম আছারু আবী হানীফা নামে উল্লেখ করেছেন আমীর ইবনে মাকুলা রহ. আল-ইকমালকিতাবে (৩/৩৯, باب الحصيني والجصيني) উল্লেখ করেন, আবূ বকর আহমদ ইবনে বকর ইবনে সাইফ তিনি আবূ ওয়াহাব থেকে, তিনি যুফার থেকে, তিনি ইমাম আবূ হানীফা থেকে কিতাবুল আছারবর্ণনা করেন

আল্লামা সামআনী রহ.ও কিতাবুল আনসাবে একই রকম উল্লেখ করেছেনআল্লামা ইয্যুদ্দীন ইবনুল আছীর রহ.ও আল-লুবাব ফি তাহ্যীবিল আনসাব১/১৯৮ কিতাবে এরকমই উল্লেখ করেছেন

আল্লামা হাফেয আব্দুল কাদের কুরাশী রহ. আল-জাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ্২/৩২৫ কিতাবে কাযী ইউসুফ ইবনে আবী ইউসুফের জীবনীতে উল্লেখ করেন, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি ইমাম আবূ হানীফা থেকে কিতাবুল আছারবর্ণনা করেন। (মুজামুল মুসান্নিফীনপৃ. ২/১৮৭ ও ১৮৮)

হাফেয ইবনে হাজার রহ. তাজীলুল মানফাআহ্  পৃ. ৫ কিতাবে উল্লেখ করেন, ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর হাদীসের একক গ্রন্থ হলো, ‘কিতাবুল আছারযা ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান রহ. তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন তিনি উক্ত কিতাবের ২০৯ নং তরজমায় আব্দুল আলার জীবনীতে আরো উল্লেখ করেন, ইমাম আবূ হানীফা রহ. তার থেকে কিতাবুল আছারে হাদীস বর্ণনা করেছেন

আরো পড়ুন এস পি সি ব্যবসা কি বৈধ?

তিনি লিসানুল মিযান৫/৩১ এ বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম ইবনে হুবাইশ তিনি মুহাম্মাদ বিন শুজাথেকে, তিনি হাসান বিন যিয়াদ থেকে, তিনি ইমাম আবূ হানীফা থেকে কিতাবুল আছারবর্ণনা করেছে (আল-ইমাম ইবনু মাজাহ্ ওয়া কিতাবুহুস সুনান পৃ. ৫২-৫৩।)

এখান থেকে স্পষ্ট হলো যে, ‘কিতাবুল আছারএটি ইমামে আযম আবূ হানীফা রহ. এর লিখিত কিতাব এবং এই বিষয়টি ঐতিহাসিকদের অনেকেই স্বীকার করেছেন যার বিবরণ আমরা ইতিমধ্যে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছি

যারা কিতাবুল আছারকে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর কিতাব বলতে চান না:

অবশ্য কেউ কেউ কিতাবুল আছারকে ইমামে আযম আবূ হানীফা রহ. দিকে সম্বন্ধ করেন নাবরং তা ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর দিকে সম্বন্ধ করে কিতাবটি ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর বলতে চান

আল্লামা হাজী খলীফা রহ. কাশফুয যুনূনকিতাবে ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর দিকে সম্বন্ধ করেছেনএরকম আরো অনেকেই করেছেন। (বিস্তারিত দেখুন: ইবনে মাজাহ্ আওর ইলমে হাদীসপৃ. ২৭৬-২৭৮, ‘তাবসিরাহ্ বর মাদখালপৃ. ৫৩-৫৪)

এমনটি বলার কারণ কি?

আসল কথা হলো, কিতাবটি মূলত: ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর রচিত কিতাবইমাম মুহাম্মদ রহ. তা বর্ণনা করেছেন মাত্রযেমন মুআত্ত্বাকিতাবটি ইমাম মালেক রহ. এর রচিত কিতাব

ইমাম মুহাম্মদ ও ইয়াহয়া ইয়া বিন ইয়াহয়া মাসমূদী তার বর্ণনাকারী মাত্রএখন মুআত্ত্বাকিতাবকে যদি ইমাম মালেক রহ. এর দিকে সম্বন্ধ না করে ইয়াহয়া বিন ইয়াহয়া মাসমূদী কিংবা ইমাম মুহাম্মদের কিতাব বলা হয় তাহলে তা হবে মারাত্নক বোকামী

কারণ, রচয়িতা স্বয়ং ইমাম মালেক রহ., আর বাকীরা তার বর্ণনাকারী মাত্রঠিক একই কথা কিতাবুল আছার সম্পর্কেওমূল লেখক ইমাম আবূ হানীফা রহ.ইমাম মুহাম্মদ রহ. তার বর্ণনাকারী মাত্র সুতরাং কিতাবুল আছারকে ইমাম আবূ হানীফার লিখিত কিতাব না বলে ইমাম মুহাম্মদের কিতাব বলা বোকামী বৈ কিছুই নয়

হ্যাঁ, বর্ণনাকারী হিসেবে ইমাম মুহাম্মদের নাম আসতে পারে এবং আসাটাই স্বাভাবিককারণ, বর্ণনাকারী হিসেবেও কিতাবের সম্বন্ধ হয়ে থাকে। (দেখুন: উসূলে ইফতার শরাহ্ আল-ফাতহুর রব্বানীপৃ. ৩৬৩, ৪০৭)

এমনকি কখনো কখনো কিতাবের লেখক ছাত্র হওয়ার পারও সম্বন্ধ উস্তাযের দিকে হয়ে থাকেযেমন : হযরত মুশাহিদ বাইয়মপুরী রহ. (১৩২৭-১৩৯০ হি.) কাফিয়ার প্রসিদ্ধ শরাহ্ ইযাহুল মাতালিবতার শায়েখ মাশিয়্যাতুল্লাহ্রহ. এর নির্দেশে লেখেন

কিন্তু কিতাবটি ছাপে তার উস্তাযের নামে। (বাংলার বরেণ্য আলেম ১/২১৮) তো সম্বন্ধ অনেক সময় বর্ণনাকারী বা শাগরিদ বাদ দিয়ে শায়েখের দিকে হয়ে থাকেকিন্তু এর অর্থ আদৌ এটা নয় যে, ঐ শায়েখ বা বর্ণনাকারীই কিতাবের আসল রচয়িতা

আরেকটি বিষয় হলো, কেউ কেউ আবার কিতাবুল আছারকে ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর কিতাব এজন্য বলতে চান যে, ইমাম মুহাম্মদ রহ. তাতে অনেক বর্ণনা নিজ থেকে সংযোজন করেছেন

সুতরাং কিছু বর্ণনা যেহেতু নিজ থেকেও এনেছেন তাই উক্ত কিতাব ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর হওয়াটাই বাঞ্ছণীয়কিন্তু এমন কথা বলার আগে অন্যান্য কিতাব সম্পর্কেও অবশ্যই প্রশ্নকারীর এমন মন্তব্য হওয়া উচিৎ

পড়ুন- বরকত ও তাবাররুক নেওয়া কি বৈধ?

যদি তাই হয় তাহলে সহীহ্ বুখারী, মুসলিম, ইবনে মাজাহ্ সহ কোন কিতাবই তখন লেখকের থাকবে নাবরং বর্ণনাকারী বা নাসিখের বলতে হবে কারণ, এসকল কিতাবে বর্ণনাকারী কিংবা নাসিখের পক্ষ থেকে এরকম সংযোজন রয়েছেউদাহরণস্বরুপ নিম্নে কিছু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হলো :

* সহীহ্ বুখারী, হিন্দি নুসখা, মুহাম্মদ বিন ইউসুফ ফিরাবরী নামক নাসিখ- (১) পৃ. ২০, হাদীস নং ১০০। (২) পৃ. ২১৯ হাদীস নং ১৬১১, কিন্তু উক্ত হাদীসে মুরাক্কাম নুসখাতে নাসিখের কথাটুকু কি কারণে হযফ করে দেওয়া হয়েছে তা আমার জানা নেইহিন্দি নুসখার উল্লেখিত পৃষ্ঠায় নাসিখের কথা রয়েছে। (৩) পৃ. ৩৩৬, হাদীস নং ২৪৭৫

* সহীহ্ মুসলিম, হিন্দি নুসখা- (১) আবূ ইসহাক ইবরাহীম নামক নাসিখ পৃ. ১/১৭। (২) পৃ. ১৭৪ হাদীস নং ৪০৪। (৩) পৃ. ৪৯৫ হাদীস নং ১৫০৬ কিন্তু উক্ত হাদীসে মুরাক্কাম নুসখাতে নাসিখের কথাটুকু কি কারণে হযফ করে দেওয়া হয়েছে তা আমার জানা নেইহিন্দি নুসখার উল্লেখিত পৃষ্ঠায় নাসিখের কথা রয়েছে। (৪) আবূ আহমদ জুলূদী নামক নাসিখ পৃ. ২/৪৮ হাদীস নং ১৬৫২

* সুনানে ইবনে মাজাহ্, আবুল হাসান ইবনে সালামা আল-কাত্ত্বান নামক নাসিখহাদীস নং ৮৪, ২৪১, ২৪৪, ২৫২, ২৫৭, ২৯৪, ২৯৯, ৩০০, ৩০৭, ৩২৪, ৩২৬, ৩৪৬, ৩৫০, ৩৫৬, ৩৫৮, ৩৭৪, ৩৮৮, ৪০০, ৪০২, ৪১৩, ৪৪৬, ৪৫১, ৪৬২, ৪৬৯, ৫২৬হিন্দি নুসখার ৪২ পৃষ্ঠার মধ্যে নাসিখের কথা এসেছে ২৫ বার

যার হাদীস নম্বরগুলো আমি ইতিমধ্যে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছিতাহলে পুরো কিতাবে কি পরিমাণে এসেছে তা সহজেই অনুমেয়এই পরিমাণ সংযোজন সম্ভবত কিতাবুল আছারেও নেই

এহলো হাদীসের কিতাবসমূহ থেকে কয়েকটি উদাহরণমাত্রনতুবা এরকম সংখ্যা গণনাতীতযে কেউ তালাশ করলে এরকম উদাহরণ পাবে অসংখ্য ও অগণিতনমুনাস্বরুপ কেবল দুচারটি উদাহরণ পাঠকের সামনে পেশ করা হয়েছে

প্রিয় পাঠক! লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এত বিপুল পরিমাণে নাসিখের কথা থাকার পরও যদি কিতাবটি ইমাম ইবনে মাজাহ্ রহ. এর হতে পারে, তেমনিভাবে সহীহ্ বুখারীতে ফিরাবরীর কথা এবং সহীহ্ মুসলিমে আবূ ইসহাক ইবরাহী ও আবূ আহমদ জুলূদীর কথা থাকার পরও যদি সেগুলো ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. এর কিতাব হতে পারে-

আরো পড়ুন- কুরবানীর মাসআলায় একটি নতুন গবেষণা

তাহলে কিতাবুল আছারে ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর কথা থাকলে তা ইমামে আযম আবূ হানীফা রহ. এর কিতাব হতে পারবে না কেন? বস্তুত এমন দাবী নিতান্তই গোড়ামী ও বোকামী বৈ কিছুই নয়

অতএব আমরা নি:সংকোচে একথা বলতে পারি যে, ‘কিতাবুল আছারইমামে আযম আবূ হানীফা রহ. এর রচিত হাদীসের অনবদ্য এক সংকলনএক্ষেত্রে ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর দিকে তার সম্বন্ধ কেবল বর্ণনার বিচারে হতে পারেরচনায় অংশ গ্রহণের বিবেচনায় নয়

পূর্বের পর্বগুলো পড়ুন- ১ম পর্ব২য় পর্ব৩য় পর্ব৪র্থ পর্ব

Post a Comment

do not share any link

নবীনতর পূর্বতন