হাদীস শাস্ত্রে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর অবদান (কিতাবুল আছার ইতিহাস, ঐতিহ্য, অবদান)
মুফতী সাঈদুর রহমান সিদ্দীক নাটোরী, খাদেমে দারুল ইফতা ও শিক্ষাসচিব- মারকাযুল উলূমিদ্ দ্বীনিয়্যাহ্, ভেলানগর, (জেলখানার মোড়), নরসিংদী, বাংলাদেশ।
পর্ব- ৬ ‘কিতাবুল আছার’ এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পূর্বের আলোচনায় একথা সুস্পষ্ট হয়েছে যে, কিতাবটি ইমামে আ‘যম আবূ হানীফা রহ. এর রচিত একটি কিতাব। যা সহীহ্ হাদীসের সর্ব প্রথম সংকলন। এর আগে হাদীসের যে সকল সংকলন রয়েছে তা ছিল নিতান্তই ব্যক্তিগত ও অবিন্যস্ত সংকলন। কিন্তু ইমাম আবূ হানীফা রহ. ব্যাপক আকারে অধ্যায় হিসেবে সুবিন্যস্ত করে রচনাটি করেছেন। তাই সহীহ্ হাদীসের প্রথম সংকলনকারী ইমাম আবূ হানীফা রহ.।
পড়ুন- আলবানীর এপিঠ ওপিঠ
এক্ষেত্রে ইমাম মালেক রহ., বুখারী রহ. ও অন্যান্যরা তাঁর অনুগামী। ইমাম আবূ হানীফা রহ. তাঁর লিখিত এই কিতাবে ঐ সকল হাদীস, আছার ও ফাতাওয়াই উল্লেখ করেছেন যার বর্ণনাকরীগণ প্রত্যেকেই নির্ভরযোগ্য। সাথে সাথে এতে আহকামের হাদীসগুলো সন্নিবেশিত হয়েছে, যা থেকে ফিকহের মাসআলা ইস্তিনবাত করা যায়। এহিসেবে কিতাবুল আছারটি সুনানের কিতাবসমূহের অন্তর্ভূক্ত। কোন কোন মুহাদ্দিস কিতাবটিকে এ নামেও উল্লেখ করেছেন। (দেখুন: ইবনে মাজাহ্ আওর ইলমে হাদীস পৃ. ২৮০)।
কিতাবুল আছারের আরেকটি বৈশিষ্ট হচ্ছে, এতে অন্যান্য গ্রন্থের মত কেবল নিজ শহর ও এলাকার বর্ণনায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং মক্কা, মদীনা, কূফা তথা হিজায ও ইরাক উভয় জায়গার ইলম সংকলিত হয়েছে। ইমাম মালেক রহ. ‘মুআত্ত্বা’ সংকলন করেছেন মদীনায়। এতে মাদানী শায়েখ ছাড়া অন্যদের বর্ণনা নামকা ওয়াস্তে কয়েকটি মাত্র পাওয়া যাবে। কিন্তু ‘কিতাবুল আছার’ কূফা কিংবা ইরাকের সাথে খাছ নয়। বরং হিজায, ইরাক, শাম ইত্যাকার অসংখ্য ইসলামী শহরের উলামায়ে কেরামের বর্ণনা রয়েছে।
পড়ুন- বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয়
আল্লামা আব্দুর রশীদ নু‘মানী রহ. বলেন, আমি ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর বর্ণিত কিতাবুল আছার -যাতে অন্যান্য নুসখার তুলনায় বর্ণনা কম রয়েছে- এর ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর শায়েখদের নাম গণনা করেছি তো তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৫। এর মধ্যে ৩০ জন এরকম পাওয়া গেছে যারা কূফায় বসবাসকারী ছিলেন না। অত:পর সাহাবায়েকেরামের মধ্য থেকে যাদের মাসায়েল ও ফিক্হ-ফাতাওয়া এতে জমা করা হয়েছে তাদের সংখ্যা ১৩০।
সাহাবায়েকেরামের মধ্যে যারা অধিক পরিমাণে ফতোয়া দিতেন তাঁরা হচ্ছেন, উমর, আলী, ইবনে মাসঊদ, ইবনে আব্বাস, আয়েশা, যায়েদ বিন ছাবেত, ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুম। এঁদের মধ্যে আবার প্রথম চার জন অগ্রগামী। এসকল সাহাবী থেকে অধিক পরিমাণে কিতাবুল আছারে বর্ণনা রয়েছে।
পড়ুন- হানাফীদের গোড়ার কথা
সে তুলনায় ‘মুআত্ত্বা’ কিতাবে তাঁদের বর্ণনা একেবারেই কম। বারো শত বছর ধরে উম্মতে মুসলিমার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ মানুষ মাযহাবে হানাফীর অনুসরণ করে আসছে। এই মাযহাবে হানাফীর মাসায়েলের মৌলিক ভিত্তি হচ্ছে ‘কিতাবুল আছার’। শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. কিতাবুল আছারকে হানাফী মাযহাবের জনক ও জননী বলেছেন। (ইবনে মাজাহ্ আওর ইলমে হাদীস পৃ. ২৫৮-২৬১, ২৭৩-২৭৬)।
কিতাবুল আছারের নুস্খাসমূহ
‘মুআত্ত্বা’ এবং অন্যান্য হাদীসের কিতাবের মত কিতাবুল আছারেরও অসংখ্য নুসখা রয়েছে। বর্ণনাকারী প্রায় ৫০০ কিংবা তারও বেশি রয়েছে। কিন্তু প্রসিদ্ধ হচ্ছে চার জন। বর্ণনাকারী হিসেবে নিম্নে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো। -(ইবনে মাজাহ্ আওর ইলমে হাদীস পৃ. ২৭৮-২৮৪, আল-ইমাম আবনু মাজাহ্ ওয়া কিতাবুহুস সুনান পৃ. ৫২-৫৩।)
এক. ইমাম যুফার ইবনুল হুযাইল রহ. (মৃত: ১৫৮ হি.)। অত:পর ইমাম যুফার রহ. থেকে তাঁর তিন জন শাগরিদ তা বর্ণনা করেছেন। আবূ ওয়াহাব মুহাম্মদ বিন মুযাহিম মারওয়াযি, শাদ্দাদ বিন হাকীম বলখী, হাকাম বিন আইয়ূব রহ.। এর মধ্যে শাদ্দাদ রহ. এর নুসখা থেকে আল্লামা খুওয়ারিযামী রহ. তার জামিউল মাসানীদে ‘মুসনাদে ইবনে খসরু এবং অন্যান্যদের হাওয়ালায় অধিক পরিমাণে বর্ণনা এনেছেন।
পড়ুন- শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ্ আবু গুদ্দাহ্ রহ.
আর হাকাম বিন আইয়ূব রহ. এর নুসখা থেকে আল্লামা ইবনে হাইয়ান তাঁর ‘তবাকাতুল মুহাদ্দিসীন বি-আসফাহান’ কিতাবে দুইটি হাদীস, ইমাম তবরানী রহ. তাঁর ‘আল-মু‘জামুস্সগীর’ কিতাবে একটি হাদীস এবং আবূ নুআঈম আসফাহানী রহ. তাঁর ‘তারীখে আসফাহান’ কিতাবে কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন।
দুই. ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. (মৃত: ১৮২ হি.)। তাঁর বর্ণিত নুসখা আল্লামা আবুল ওয়াফা আফগানী রহ. সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাসহ ১৩৫৫ হি. তে মিসর থেকে ছেপেছেন। এই নুসখার হাদীস সংখ্যা ১০৬৭। ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. থেকে ইক্ত নুসখা তাঁর দুই জন শাগরিদ বর্ণনা করেছেন।
পড়ুন- মধুপুরী সাহেবের মুনাজাত
এক হচ্ছে তাঁর ছেলে ইমাম ইউসুফ আর দ্বিতীয় জন হচ্ছে আমর বিন আবী আমর। আল্লামা খুওয়ারিযামী রহ. আমরের বর্ণনাকে জামিউল মাসানীদ কিতাবে ইমাম আবূ ইউসুফের নুসখা হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ে এই নুসখার সনদও ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. পর্যন্ত নকল করে দিয়েছেন।
তিন. ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান শাইবানী রহ. (মৃত: ১৮৯ হি.)। তাঁর বর্ণিত নুসখা অন্যান্য সকল নুসখা থেকে অধিক প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ। ইমাম মুহাম্মদ রহ. থেকেও তাঁর কয়েকজন শাগরিদ তা বর্ণনা করেছেন। বাজারে প্রকাশিত নুসখাটি তাঁর শাগরিদ আবূ হাফ্স কাবীর ও আবূ সুলাইমান জুযাজানী রহ. এর বর্ণনা।
পড়ুন- আল্লামা তাফাজ্জুল হক রহ.
রহিম একাডেমী থেকে প্রকাশিত নুসখার হাদীস সংখ্যা ৯১৬। (ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর উক্ত নুসখা বর্তমানে দারুন নাওয়াদের থেকে শায়েখ খালেদ আওয়াদ এর তাহকীকে দুই খন্ডে ছেপেছে।) তাঁর আরেকজন শাগরিদ আমর বিন আমর রহ.ও তা বর্ণনা করেছেন। খুব সম্ভব তিনি কেবল তাতে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ফাতাওয়া উল্লেখ করেননি। এবং সম্ভবত এজন্যই তাকে মুসনাদে আবী হানীফা বলা হয়।
চার. ইমাম হাসান বিন যিয়াদ রহ. (মৃত: ২০৪ হি.)। খুব সম্ভব কিতাবুল আছারের সকল নুসখা থেকে এই নুসখাটি বড় এবং অধিক হাদীস সম্বলিত। মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব দা. বা. বলেন, শুনেছি তা বাগদাদের মাকতাবায়ে তালআত এবং কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির গ্রন্থাগারে অমুদ্রিত আকারে আছে। (তালেবানে ইলম পথ ও পাথেয়, পৃ. ৩৬৮)
মুহাদ্দিস আলী বিন আব্দুল মুহসিন দাওয়ালিবী হাম্বলী রহ. নিজের ‘সাবাত’ এর মধ্যে উক্ত নুসখা থেকে ৬০টি হাদীস নকল করেছেন। যা আল্লামা যাহেদ কাউছারী রহ. তাঁর ‘আল-ইমতা বি-সীরাতিল ইমামাইন হাসান বিন যিয়াদ ওয়া সাহিবিহি মুহাম্মদ বিন শুজা’ কিতাবে উল্লেখ করে দিয়েছেন।
পড়ুন- ওমর ফারুক ত্রিপুরা হত্যা
আল্লামা খুয়ারিযামী রহ. জামিউল মাসানীদে উক্ত নুসখাকে ‘মুসনাদে আবী হানীফা লিল-হাসান বিন যিয়াদ’ নামে অভিহিত করেছেন। হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এর বর্ণনায় উক্ত নুসখাটি ছিল। এবং আল্লামা ইবনুল কাইয়িম জাওযিয়্যাহ্ রহ. এর ‘ই‘লামুল মুয়াক্কিয়ীন’ এর মুতালাআ‘ থেকেও একথা বুঝা যায় যে, নুসখাটি তাঁর সামনেও ছিল।
এছাড়াও ইমাম আবূ হানীফা রহ. থেকে কিতাবুল আছার আরো অনেকেই বর্ণনা করেছেন। যার মধ্যে তাঁর সন্তান হাম্মাদ বিন আবী হানীফা এবং মুহাদ্দিস মুহাম্মদ বিন খালেদ ওয়াহাবী রহ. অন্যতম। জামিউল মাসানীদে যার বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। এবং খুয়ারিযামী রহ. এই দুই নুসখাকে মুসনাদে আবী হানীফা নামে অভিহিত করেছেন।
আসলে মুতাকাদ্দিমীনের নিয়ম ছিল তাঁরা একই কিতাবকে একাধিক নামে অভিহিত করতেন। যেমন দারেমীকে সুনান ও মুসনাদ, তিরমিযীকে সুনান ও জামে‘ উভয়টিই বলা হয়। ঠিক একই রকম কিতাবুল আছারের এসকল নুসখাকেও কেউ কেউ মুসনাদ, সুনান এবং কিতাবুল আছার নামে অভিহিত করেছেন।
হাদীস বর্ণনায় ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর মানহাজ ও শর্তসমূহ
হাদীসের অন্যান্য গ্রন্থকারের ন্যায় ইমামে আ‘যম আবূ হানীফা রহ. এরও হাদীস বর্ণনার কিছু শর্ত রয়েছে। যা অন্যান্যদের শর্ত ও মানহাজ থেকে ভিন্ন এবং অত্যান্ত শক্তিশালী ও কঠোর। কারণ, প্রত্যেক লেখকেরই তার নিজস্ব কিছু উসূল ও মূলনীতি রয়েছে। একই লেখকের উসূল ও মূলনীতিতেও রয়েছে অনেক পার্থক্য। সে হিসেবে কিতাবুল আছারেও ইমামে আ’যম আবূ হানীফা রহ. এর মূলনীতিগুলো ভালো করে বুঝে নেওয়া চাই।
আর তিনি ছিলেন তাঁর যুগের সবচেয়ে বড় মুহাদ্দিস। যেমনটি ইমাম বুখারীর উস্তাদ মক্কী ইবনে ইবরাহীম রহ. বলেছেন। (সদরুল আইম্মাহ্ মক্কী রহ. কৃত ‘মানাকিবে ইমামে আ’যম’ পৃ. ১৯০ বৈইরুতের সংস্করণ)। তিনি বড় মাপের মুহাদ্দিস হওয়া সত্ত্বেও তার বর্ণিত হাদীস সংখ্যা তুলনামূলক কম। ইমাম আবূ হানীফা রহ. ‘বলেন, আমার কাছে হাদীসের অসংখ্য ভান্ডার রয়েছে। কিন্তু আমি কেবল ঐ সকল হাদীসই মানুষের সম্মুখে পেশ করেছি যা ফায়দা জনক’। (প্রাগুক্ত ৮৪-৮৫)।
পড়ুন- এসপিসি কি হালাল?
আলী ইবনুল জা’দ রহ. বলেন, ‘ইমাম আবূ হানীফা রহ. হাদীস বর্ণনা করলে মুক্তার মত (স্বচ্ছ, শুভ্র ও বিশুদ্ধ) হাদীস বর্ণনা করেন’। (জামিউ মাসানিদিল ইমাম আ’যম ২/৩০৮)। ওয়াকী ইবনুল র্জারাহ্ রহ. বলেন, ‘হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে ইমাম আবূ হানীফার মধ্যে যেরুপ খোদাভিরুতা পাওয়া যায় তা আর অন্য কারো মধ্যে পাওয়া যায় না’। (আল-ইমাম আবনু মাজাহ্ ওয়া কিতাবুহুস সুনান পৃ. ৫৭)
সুফিয়ান ছাউরী রহ. বলেন, ‘ইমাম আবূ হানীফা রহ. কেবল সহীহ্ হাদীস গ্রহণ করেন। যার বর্ণনাকারী প্রত্যেকেই নির্ভরযোগ্য এবং তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বশেষ কর্মটি গ্রহণ করেন। সাথে সাথে কূফার উলামায়েকেরাম কে যে কর্মের উপর পেয়েছেন তাও গ্রহণ করেছেন। এরপরও কিছু নির্বোধ লোক তাকে দোষারোপ করেছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে ও তাদেরকে ক্ষমা করুন।’ (আল-ইন্তিকা পৃ. ২৬২)
পড়ুন- বুযুর্গদের তাবাররুক বা বরকত নেওয়া কি
একবার সুফিয়ান ছাউরীর কাছে জনৈক ব্যক্তি এসে প্রশ্ন করল, আপনাকে ইমাম আবূ হানীফার ব্যাপারে কিছুটা ক্রুদ্ধতা দেখায় কেন? উত্তরে তিনি বললেন, আমি ইমাম আবূ হানীফাকে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন, ‘দলীল হিসেবে প্রথমে আমি আল্লাহর কিতাব গ্রহণ করি, অতঃপর তাঁর রাসূলের সুন্নত এরপর সহীহ্ আছার। যার বর্ণনাকারী সকলেই নির্ভরযোগ্য। এসব না পেলে তাঁর সাহাবীদের মধ্য থেকে যে কারো কথা আমি দলীল হিসেবে পেশ করি। বিষয়টি যখন ইবরাহীম, শা’বী, হাসান, আতা রহ. পর্যন্ত গড়ায় তখন তাদের ইজতেহাদের ন্যায় আমিও ইজতেহাদ করি’। (আল-ইন্তেকা পৃ. ২৬১-২৬২)
আল্লামা আব্দুল ওয়াহাব শা’রানী রহ. বলেন, ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর কাছে কোন হাদীস আমলযোগ্য হওয়ার জন্য শর্ত হলো, বর্ণনাকারী সকলেই মুত্তাকী ও পরহেযগার হওয়া। -(আল-ইমাম ইবনু মাজাহ্ ওয়া কিতাবুহুস সুনান পৃ. ৫৪) এজন্যই আল্লামা ইবনু আব্দিল বার রহ. বলেছেন, আহলে হাদীসের অনেকে ইমাম আবূ হানীফার ব্যাপারে নিন্দা পোষণ করে থাকে। কারণ, তিনি হাদীসকে উসূলে মুসাল্লামা ও কুরআনের দ্বারা পরখ করেন। কোন খবরে ওয়াহেদ এর ব্যতিক্রম হলে তিনি তা পরিত্যাগ করেন এবং তার নাম দেন ‘শায’।’ (আল-ইন্তিকা পৃ. ২৭৬)
পড়ুন- কুরবানী সম্পর্কে একটি নতুন মাসআলা
এটাই হলো হানাফী মাযহাবের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট। যা তাদেরকে ইলমে শরীয়তের গভীরে পৌঁছিয়েছে। এমনিভাবে কোন খবরে ওয়াহেদ যদি কিতাবুল্লার ‘আম’ ও ‘মুতলাক’ এর বিপরীত হয় তবে তাও পরিত্যাগ করা হয় এবং উভয় ক্ষেত্রে শক্তিশালী দলীলকে গ্রহণ করা হয়। (এটার জন্য আল্লামা জাস্সাস রহ. এর ‘আল ফুসূল’, বাহরুল উলূম নেআমতুল্লা আ’যমী সাহেবের ‘নুখাবুল আখবার’ এর উপর লিখিত ভূমিকা, ‘তানীবুল খতীব’ পৃ. ২৯৮ এবং ‘মাবাদিউ ইলমিল হাদীস’ পৃ. ১৬৮ দেখা যেতে পারে।)
‘আল-মাদখাল ফি উসূলিল হাদীস’ (পৃ. ১৫) কিতাবে হাকেম নিশাপুরী রহ. লেখেন, ইমাম আবূ হানীফা রহ. বলেন, ‘মুহাদ্দিসের যবান থেকে কোন হাদীস শুনে মুখস্থ করা এবং অন্যের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত ধীশক্তিতে আয়ত্ব করা ছাড়া কারো কাছে হাদীস বর্ণনা করা জায়েয নয়’।
পড়ুন- মোবাইলে কি বিবাহ করা যায়?
একই কথা হাফেয খতীব বাগদাদী রহ.ও তাঁর ‘আল-কিফায়া’ নামক কিতাবে (পৃ. ২৩১) উল্লেখ করেছেন। এজন্যই হাফেয সুয়ূতী রহ. বলেন, ‘এক্ষেত্রে ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর মাযহাব খুবই কঠোর। এহিসেবে সহীহ্ বুখারী-মুসলিম এর হাফেয রাবীদের সংখ্যা অর্ধেকও পৌঁছবে না’। (ইবনে মাজাহ্ আওর ইলমে হাদীস পৃ. ২৭১)
সার কথা হলো, হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে ইমামে আ’যম আবূ হানীফা রহ. এর রয়েছে স্বতন্ত্র ও নিজস্ব কিছু উসূল। যা অন্যদের তুলনায় কিছুটা শক্ত ও কঠিন এবং যা শরীয়তের মেযাজের সাথে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ। মূলত: এগুলোই তার অগ্রযাত্রার মূল চাবিকাঠি। যা তাঁকে আহলে ইলমের কাছে ইমামে আ’যম হিসেবে গড়ে তুলেছে। এ পর্যায়ে ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর স্বতন্ত্র কিছু উসূল পাঠকের কাছে তুলে ধরবো। যাতে হাদীস শাস্ত্রে ইমাম সাহেবের মর্যাদা আমাদের কাছে আরো শক্তিশালী ও সুদৃঢ় হয়।
পড়ুন- পশ্নোত্তর পর্ব
এই মূলনীতিগুলো উলামায়েকেরাম বিভিন্ন কিতাবে বিক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করেছেন। যেমন : আল্লামা কাউছারী রহ. তানীবুল খতীব (পৃ. ১৫২-১৫৫) কিতাবে উল্লেখ করেছেন। পাঠকের সুবিধার্থে আমি এখানে সংক্ষিপ্তাকারে তার কিছু উল্লেখ করছি।
এক. ছেকা (নির্ভরযোগ্য) রাবীদের বর্ণিত মুুরসাল হাদীস তারচেয়েও শক্তিশালী হাদীসের বিরোধী না হলে তা গ্রহণীয়। কেননা, মুরসাল ছেড়ে দেওয়া মানে সুন্নাহর অর্ধেকই পরিত্যাগ করা।
দুই. কোন খবরে ওয়াহেদ স্বতঃসিদ্ধ উসূলের বিরোধী হলে তা ছেড়ে শক্তিশালীর উপর আমল করতঃ মূলনীতিকে গ্রহণ করা। অবশ্য এসব মূলনীতিগুলো শরীয়তের মৌলিক উৎস থেকেই গৃহীত।
তিন. কোন খবরে ওয়াহেদ কিতাবুল্লাহর আম ও যাহেরের সাথে বিরোধ হলে কিতাবুল্লাকে গ্রহণ করা।
চার. কোন খবরে ওয়াহেদ আমলে মুতাওয়ারাছ (সাহাবা-তাবেঈনের মাঝে প্রচলিত আমল) এর মুখালিফ না হওয়া।
পাঁচ. খবর ওয়াহেদ কোন ফে’লী কিংবা কওলী মশহুর সুন্নাহর মুখালেফ না হওয়া।
ছয়. ‘উমূমে বালওয়া’ এর ক্ষেত্রে খবরে ওয়াহেদকে গ্রহণ না করা। যেমন ‘কুল্লাতাইন’ এর হাদীস। দেখুন: ইবনে মাজাহ্ আওর ইলমে হাদীস পৃ. ৩২৩ ইবনুল কাইয়িম রহ. এর বক্তব্য।
সাত. বর্ণনাকারী সাহাবী তার বর্ণিত হাদীসের বিপরীত আমল না করা। কেননা, তা মানসূখ হওয়ার দলীল।
আট. যে দিকে হাদীসের আধিক্য বেশী তাই গ্রহণ করা।
নয়. সালাফের কেউ সে বিষয়ে খন্ডন না করা।
দশ. হাদীস শোনা থেকে নিয়ে বর্ণনা করা পর্যন্ত ধীশক্তিতে পূর্ণ আয়ত্ব রাখা। মাঝখানে ভুলে যাওয়ার অভিযোগ না থাকা।
এগারো. হুদূদ’ ও ‘উকূবাত’ এর ক্ষেত্রে সতর্কতার উপর আমল করা।
বারো. বর্ণনাকারী তার নিজের লেখার উপর ভরসা না করা।
পড়ুন- আল্লামা আবুল ওয়াফা আফগানী রহ.
এতো কঠিন ও শক্ত নীতি থাকা সত্ত্বেও ইমাম আবূ হানীফা রহ. তার এই কিতাবুল আছারকে চল্লিশ হাজার হাদীস থেকে বাছাই করে লিপিবদ্ধ করেছেন। (আল-ইমাম ইবনু মাজাহ্ ওয়া কিতাবুহুস সুনান পৃ. ৫৪)। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁর মাঝে আর সাহাবীর মাঝে মধ্যস্থতা রয়েছে কেবল দুই জন। নীতির কঠোরতা, হাদীস বর্ণনায় ভীরুতা, মধ্যস্থতার স্বল্পতা, উপরন্তু খাইরুল কুরুন যুগের হওয়া, হাদীসের বিশুদ্ধতার স্তরকে কোন পর্যায়ে নিয়ে পৌঁছায় তা বোধহয় আর বুঝিয়ে বলার দরকার নেই।
হাদীসের মোট সংখ্যা কত?
মূলত হাদীস এগুলোই। আর আমরা উলামায়ে কেরামের মুখে যে লক্ষ লক্ষ হাদীসের কথা শুনি তার অর্থ হলো, পরবর্তী যুগে সনদের সংখ্যাধিক্যের কারণে হাদীসের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ, মুহাদ্দিসীনে কেরাম একেকটি সনদকে একেকটি হাদীস গণ্য করেন।
ইমাম মালেক ইবনে আনাস রহ. বলেন, ‘আমি এক লাখ হাদীস লিখেছি’। কাযী ইবনুল মুনতাব বলেন, ’ইমাম মালেকের এক লক্ষই আমাদের যুগে এসে সনদের বিভিন্নতা ও সংখ্যাধিক্যের কারণে লক্ষ লক্ষ হাদীসে পরিণত হয়েছে’। (আল্লামা যারকাশী রহ. কৃত ‘নুকাত’ পৃ. ১/১৮৪-১৮৫)।
পড়ুন- মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব, জীবন ও কর্ম
আসলে হাদীসের মোট সংখ্যা তাকরার বাদ দিয়ে চার হাজার চার শত। সাহাবা-তাবেঈ এবং তাবে তাবেঈর আছার, ফাতাওয়া, কোন মুবহাম ও গরীব শব্দের সনদসহ ব্যাখ্যা- এসবই হাদীস হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই হাদীসের সংখ্যা এতো বৃদ্ধি পেয়েছে। (বিস্তারিত দেুখুন: ‘ছালাছু রাসায়েল’ পৃ. ৩৫-৩৭, ‘ইবনে মাজাহ্ আওর ইলমে হাদীস’ পৃ. ৮৪ ও ২৬৬, ‘কিমাতুয যামান ইনদাল উলামা’ পৃ. ৬৬।)
যাইহোক! আমাদের আলোচিত ‘কিতাবুল আছার’ ইমামে আ’যম আবূ হানীফা রহ. এর লিখিত হাদীস শাস্ত্রের এক অনবদ্য গ্রন্থ। যা তিনি গ্রহণ করেছেন উম্মতের ন্যায়নিষ্ঠার প্রতিক, নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিস, খাইরুল কুরুন যুগের অনুসৃত ও সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাবেঈদের কাছ থেকে। যে যুগে রয়েছে স্বয়ং রাসূলে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কল্যাণের সনদ। -(তাঁর মানহাজ ও শর্ত সম্পর্কে দেখুন : ‘আল-ইমাম ইবনু মাজাহ্ ওয়া কিতাবুহুস সুনান’ পৃ. ৫৪-৫৬।)
পূর্বের পর্বগুলো পড়ুন- ১ম পর্ব, ২য় পর্ব, ৩য় পর্ব, ৪র্থ পর্ব, ৫ম পর্ব
আগামী পর্ব তথা শেষ পর্বে পড়ুন- ইমাম আবু হানীফা রহ. এর লিখিত কিতাব সমূহের তালিকা এবং কিতাবুল আছারের উপর উলামায়ে কেরামের ইলমী কারনামা এবং ইমাম আবু হানীফা রহ. এর হাদীস শাস্ত্রে অভূতপূর্ব যোগ্যতার কিছু নমুনা।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
do not share any link