হাদীস শাস্ত্রে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর অবদান (কিতাবুল আছার ইতিহাস, ঐতিহ্য, অবদান)

মুফতী সাঈদুর রহমান সিদ্দীক নাটোরী, খাদেমে দারুল ইফতা ও শিক্ষাসচিব- মারকাযুল উলূমিদ্ দ্বীনিয়্যাহ্ভেলানগর,(জেলখানার মোড়)নরসিংদীবাংলাদেশ 

পর্ব- ৭ শেষ পর্বঃ  কিতাবুল আছারের উপর উম্মতের উলামায়েকেরামের কিছু খেমদত এবং এছাড়াও ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর মাসানীদ সহ তাঁর আরো কিছু সংকলনের আলোচনা

ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর কিতাবুল আছার (ইমাম মুহাম্মদ এর নুসখা) এর রিজাল নিয়ে কিতাব লিখেছেন হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ.নাম দিয়েছেন আল-ইছার বি-মারিফাতি রুওয়াতিল আছার এটি মুদ্রিতআল্লামা আব্দুর রশীদ নুমানী রহ. তার রিজালের উপর স্বতন্ত্র কিতাব লিখেছেন এবং হাদীসগুলোকে মাসানীদে সাহাবার উপর তারতীব দিয়েছেন এবং তিনি এর উপর একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ লেখারও ঘোষণা দিয়েছেনসম্ভবত তা ছেপেছে। (ইবনে মাজাহ্ আওর ইলমে হাদীস পৃ. ২৮১)

শায়েখ কিয়ামুদ্দীন আব্দুল বারী লাখনোভী (মৃত: ১৩৪৪ হি.) শরাহ্ লিখে নাম দিয়েছেন আত-তালীকুল মুখতার আলা কিতাবিল আছার এর শুরুতে ১৪৬ পৃষ্ঠা সম্বলিত একটি মুকাদ্দিমা সহ করাচির আর-রহীম একাডেমী থেকে তা ছেপেছেআর ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. এর নুসখার সংক্ষিপ্ত শরাহ্ লিখেছেন আল্লামা আবুল ওয়াফা আফগানী রহ.যা এখন প্রকাশিত

how-to-do-nikah-online 

এছাড়াও ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর বিভিন্ন বিষয়ে অসংখ্য কিতাব রয়েছে ১. কিতাবুর রায়২. কিতাবু ইখতিলাফিস সাহাবা৩. কিতাবুল জামে৪. কিতাবুস সিয়ার৫. আল-কিতাবুল আওসাত৬. আল-ফিকহুল আকবার৭. আল-ফিকহুল আবসাত৮. কিতাবুল আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম৯. কিতাবুর রদ আলাল কাদরিয়া১০. রিসালাতুল ইমাম ইলা উসমান বাত্তী১১. মাকাতিব ওয়া ওয়াসায়া অর্থাৎ বিভিন্ন চিঠি ও অসিয়্যতএর মধ্যে ৬, , ৮ ও ১০ নং কিতাবগুলো আল্লামা যাহেদ কাওসারী রহ. এর তাহকীকে ছেপেছে। (সিয়ারু আইম্মাতিল আহনাফ পৃ. ১৬২)

এছাড়াও ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর হাদীসের অসংখ্য মুসনাদ রয়েছেযার সংখ্যা প্রায় আঠাশটিতার মধ্যে আল্লামা খুয়ারিযামী রহ. (৬৫৫ হি.) এর জামিউল মাসানীদ এর মধ্যে পনেরটি মুসনাদ রয়েছেযা এখন বাজারে মুদ্রিত আকারে পাওয়া যাচ্ছেইমাম দারাকুতনী ও আল্লামা ইবনে শাহিনের বর্ণিত মুসনাদে আবী হানীফা রয়েছেহাফেয খতীব বাগদাদী যখন দামেস্কে সফর করেন তখন এই মুসনাদ দুইটি সাথে নিয়েছিলেন। (দেখুন: তানীবুল খতীব, পৃ. ৩০৫-৩০৬।)

what-are-rules-of-qurbani (কুরবানীর একটি গবেষণাধর্মী মাসআলা) 

হাফেয ইবনে আসাকির রহ. (৫৭১ হি.) এরও বর্ণিত মুসনাদে আবী হানীফা রয়েছে। (সিয়ারু আলামিন নুবালা ১৫/২৪৯-২৫০)হাফেয সাখাভী রহ. এর রয়েছে আত-তুহফাতুল মুনীফাহ্ ফিমা ওয়াকায়া লী মিন হাদীসিল ইমাম আবী হানীফা আরেকটি মুসনাদ হলো, আল্লামা ইবনে খসরু রহ. (৫২৩ হি.) বর্ণিত মুসনাদে আবী হানীফা আল্লামা হারেছী রহ. (৩৪০ হি.) বর্ণিত মুসনাদে আবী হানীফারয়েছে এই উভয়টি তথা ইবনে খসরু ও হারেছী রহ. বর্ণিত মুসনাদে আবী হানীফা বর্তমানে লতীফুর রহমান বাহরায়েজী সাহেবের তাহকীকে ছেপেছে

আল্লামা হারেছীর বর্ণিত মুসনাদের তারতীব দিয়েছেন হাফেয কাসেম ইবনে কুতলূবুগা রহ. (৮৭৯ হি.)আর মুখতাসার লিখেছেন আল্লামা খাসকাফী রহ. (৬৫০ হি.)অবশ্য তিনি মুসনাদে ইবনে খসরু থেকে কিছু বর্ণনা ইযাফা করেছেনএটিও এখন মুদ্রিতআল্লামা মুল্লা আলী কারী রহ. (১০১৪ হি.) খাসকাফী রহ. বর্ণিত মুসনাদে আবী হানীফার শরাহ্ লিখেছেননাম দিয়েছেন সানাদুল আনাম শরহু মুসনাদিল ইমাম (মুদ্রিত)

islamic-questions-and-answers-in-bengali (বুযুর্গদের থেকে বরকত নেওয়া কি জায়েয?) 

আল্লামা মুহাম্মাদ হাসান সাম্ভালী রহ.ও এর একটি শরাহ্ লিখেছেননাম দিয়েছেন তানসীকুন নিযাম (মুদ্রিত)উক্ত মুসনাদের তারতীব দিয়ে শরাহ্ লিখেছেন আল্লামা আবেদ সিন্ধী রহ. (১২৫৭ হি.)নাম দিয়েছেন আল-মাওয়াহিবুল লাতিফাহ্ ফিল হারামিল মক্কী আলা মুসনাদি আবী হানীফা লিল খাসকাফী বর্তমানে এটি শায়েখ তকী উদ্দীন নদভী সাহেবের তাহকীকে সাত খন্ডে ছেপেছেআল্লামা আহমদ বিন আব্দুর রহমান বান্না সাআতী রহ.ও (১৩৭৮ হি., যিনি হাসানুল বান্না রহ. এর সম্মানিত পিতা।) উক্ত মুসনাদের তারতীব দিয়েছেননাম রেখেছেন হিদায়াতুল মুকতাফী বিতারতীবি আহাদীসিল খাসকাফী

পূর্বোল্লিখিত আল্লামা হারেছী রহ. বর্ণিত মুসনাদ এর মুখতাসার লিখেছেন আবূ আব্দিল্লাহ্ মুহাম্মদ বিন আব্বাদ খাল্লাতী (৬৫২ হি.) রহ.নাম দিয়েছেন মাকসিদুল মুসনাদ এমনিভাবে মুহাম্মদ বিন আহমদ বিন মাসঊদ ইবনুস সিরাজ কাউনায়ী (৭৭০ হি.) রহ.ও হারেসীর মুসনাদের মুখতাসার লিখেছেন এবং ফিকহী অধ্যায়ে তারতীব দিয়েছেন

spc কি হালাল নাকি হারাম?

নাম দিয়েছেন আল-মুতামাদ ফী-আহাদীসিল মুসনাদ আল্লামা ইবনে হামযা হুসাইনী রহ. (৭৬৫ হি.) ইমাম আবূ হানীফার মুসনাদের রিজাল নিয়ে কিতাব লিখেছেননাম দিয়েছেন, আত-তাযকিরাহ্ বিরিজালিল আশারাহ সিহাহ্ সিত্তাহ্ ওয়া মুসনাদে আহমদ ওয়া শাফেয়ী ওয়া আবী হানীফা উস্তায মুহাম্মাদ আমীন আওরকযায়ীর কিতাব রয়েছে মাসানীদুল ইমাম আবী হানীফা ওয়া আদাদু মারবিয়্যাতিহি মিনাল মারফূয়াত ওয়াল আছার আর ইমাম আবূ হানীফার হাদীস সমূহের আতরাফ নিয়ে কিতাব লিখেছেন আল্লামা মুহাম্মদ ইবনে তাহের মাকদিসী রহ. (৫০৭হি.)নাম দিয়েছেন আতরাফু আহাদীসি আবী হানীফা

তারা কেমন কিতাব প্রেমিক ছিলেন? 

আল্লামা শারানী রহ. বলেন, আলহামদুলিল্লাহ্! আল্লাহর মেহেরবানী যে, ইমাম আবূ হানীফার মাসানীদ সমূহের তিনটি মুসনাদ আমার মুতালাআকরার সুযোগ হয়েছেদেখলাম, তিনি হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন যুগশ্রেষ্ঠ তাবেঈনেকেরাম থেকেযারা প্রত্যেকেই আদেল ও নির্ভরযোগ্যতাদের মধ্যে মিথ্যুক তো দূরের কথা মিথ্যার সন্দেহ করা যায় এমন কেউ নেই। (কাওয়ায়েদ ফি উলূমিল হাদীস পৃ. ২২০) ইমাম আবূ হানীফার এত অসংখ্য হাদীসের কিতাব থাকা সত্বেও তাকে হাদীসের ক্ষেত্রে দুর্বল বলা, হাদীস সম্পর্কে অজ্ঞ বলা কত বড় মারাত্নক বোকামি তা বলাই বাহুল্যআল্লাহ্ আমাদের সকলকে সহীহ্ বুঝ দান করুনআমীন

কেমন ছিলেন ইমামে আযম আবূ হানীফা রহ.? হাদীসের কিতাব লেখার যোগ্যতা কি তার ছিল?

ইমামে আযম আবূ হানীফা রহ. এর ফাযায়েল, মানাকেব ও তাঁর উপর আরোপিত অপবাদসমূহের জবাব জানার জন্য নিম্নের কিতাবগুলো পড়া যেতে পারে

এক. ইবনু আবীল আওয়াম (৩৩৫ হি.) কৃত ফাযাইলু আবী হানীফা ওয়া আখবারুহু ওয়া মানাকিবুহুমুদ্রিত

দুই. আবু আব্দিল্লাহ্ হারেছী (৩৪০) কৃত কাশফুল আছারিশ শরীফাহ্ ফী মানাকিবিল ইমাম আবী হানীফাহ্মুদ্রিত

তিন. আবূ আব্দিল্লাহ্ সাইমারী (৪৩৬ হি.) কৃত আখবারু আবী হানীফা ওয়া আসহাবুহুমুদ্রিত

চার. ইবনু আব্দিল বার মালেকী (৪৬৩ হি.) কৃত আল-ইন্তেকা ফি ফাযাইলিল আইম্মাতিস সালাসাতিল ফুকাহামুদ্রিত

পাঁচ. মুয়াফ্ফাক মক্কী (৫৬৮ হি.) কৃত মানাকিবু আবী হানীফামুদ্রিত

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই মেসেজটি কেন? 

ছয়. হাফেয যাহাবী শাফেয়ী (৭৪৮ হি.) কৃত মানাকিবু আবী হানীফামুদ্রিত

সাত. মুহাম্মাদ কারদারী (৮২৭ হি.) কৃত মানাকিবু আবী হানীফামুদ্রিত

আট. হাফেয সুয়ূূতী শাফেয়ী (৯১১ হি.) কৃত তাবয়ীযুস সহীফাফি মানাকিবি আবী হানীফামুদ্রিত

নয়. মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ সালেহী শাফেয়ী (৯৪২ হি.) কৃত উকূদুল জুমান ফি মানাকিবি আবী হানীফা নুমানমুদ্রিত

দশ. ইবনে হাজার মক্কী শাফেয়ী (৯৭৩ হি.) কৃত আল-খাইরাতুল  হিসান ফি মানাকিবিল ইমামিল আযম নুমানমুদ্রিত

এগারো. শায়েখ যফর আহমদ উছমানী (১৩৯৪ হি.) কৃত আবূ হানীফা ওয়া আসহাবুহুল মুহাদ্দিসূনমুদ্রিত

I-met-Jamia-Rahmania-Arabia-Dhaka-Secretary-General-Maulana-Mahfuzul-Haque (আমার দেখা রহমানিয়া) 

বারো. শায়েখ আব্দুর রশীদ নুমানী (১৪২০ হি.) কৃত মাকানাতু আবী হানীফা ফিল হাদীসঅধম উক্ত কিতাবের সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছিমুফতী হিফযুর রহমান সাহেব দা. বা. এর সম্পাদনায় তা ছেপেছে

তের. আল্লামা সরফরায খান সফদর কৃত (১৪৩০ হি.) মাকামে আবী হানীফামুদ্রিত

চৌদ্দ. ডক্টর মুহাম্মাদ কাসেম হারেসী কৃত মাকানাতু আবী হানীফা বাইনাল মুহাদ্দিসীন৬০০ পৃষ্ঠা সম্বলিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কিতাব। (আছারুল হাদীস পৃ. ১৮১)মুদ্রিত

পনের. শায়েখ আবূ যুহরা কৃত আবূ হানীফা হায়াতুহু ওয়া আসরুহু ওয়া ফিকহুহু ওয়া আরাউহুমুদ্রিত

ষোল. শায়েখ মুহাম্মাদ আলী সিদ্দীকী কৃত ইমামে আযম আওর ইলমে হাদীসমুদ্রিত

সতের. শায়েখ আব্দুশ শহীদ নুমানী কৃত ইমাম আবূ হানীফা কী তাবিইয়্যাত আওর সাহাবা সে উনকি রেওয়ায়াতমুদ্রিত

ছাত্রদের উদ্দেশ্যে যা বললেন মুফতী মাহফুজুল হক 

আঠারো. শায়েখ যাহেদ কাউসারী (১৩৭১ হি.) কৃত তানীবুল খতীবখতীব বাগদাদী ইমাম আবূ হানীফা সম্পর্কে যে সব অপবাদ উল্লেখ করেছেন কিতাবটি তার খন্ডনে লোখা হয়েছেমুদ্রিত

উনিশ. শায়েখ যাহেদ কাউসারী কৃত আন-নুকাতুত তরীফাযা ইবনু আবী শাইবার খন্ডনে লেখা হয়েছেমুদ্রিত

বিশ. আবুল মুযাফ্ফর ঈসা ইবনুল মালিকিল আদিল সাইফুদ্দীন (৬২৪ হি.) কৃত আস-সাহমুল মুসীব ফি কাবিদিল খতীবযা খতীব বাগদাদীর খন্ডনে লেখা হয়েছেমুদ্রিত

একুশ. মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব দা. বা. কৃত আবূ হানীফা আল-মুফতারা আলাইহিঅপ্রকাশিত

ওমর ফারুক ত্রিপুরা হত্যা 

এছাড়াও অসংখ্য কিতাব ইমাম আবূ হানীফার মর্যাদা ও তার স্বপক্ষে খন্ডনে লেখা হয়েছেএখানে কেবল প্রকাশিত (শেষটি বাদ দিয়ে) কিতাবের তালিকাই পেশ করা হয়েছেপাঠককে অনুরোধ করবো তারা যেনো অন্তত এর কোন একটি পড়ে নেয়

হাদীস শাস্ত্রে ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর অভূতপূর্ব যোগ্যতার কিছু নমুনা, যা আপনার ভুল ভেঙ্গে দিবে

একদা লাইছ বিন সাইমাম মালেক রহ. কে ঘর্মাক্ত অবস্থায় দেখে বললেন, হযরত! আপনি তো ঘেমে একবারে ভিজে গেলেন? কী হয়েছে আপনার? ইমাম মালেক রহ. বললেন, আমি আবূ হানীফার সাথে ইলমী বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ঘেমে গেছিহে মিসরবাসী শুনে রাখ! আবূ হানীফা একজন বড় ফকীহ। (ফিকহু আহলিল ইরাক পৃ. ৬৭) এজন্যই তো তাঁকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল আবূ হানীফাকে দেখেছেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, হ্যাঁ, তিনি এমন এক ব্যক্তি যদি এই খুটিকে স্বর্ণের খুটি বলে প্রমাণ করতে চান তবে অবশ্যই তার স্বপক্ষে তিনি দলীল নিয়ে আসবেন। (যাহাবী রহ. কৃত মানাকিবু আবী হানীফাপৃ. ২৬।) ইমাম মালেক রহ. ইমাম আবূ হানীফার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফতোয়া দিতেন কিন্তু তা তিনি প্রকাশ করতেন না। (কাওয়ায়েদ ফি উলূমিল হাদীস পৃ. ৩২৬)

islamic-contemporary-q (প্রশ্নোত্তর পর্ব) 

ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, আমি ইমাম আবূ হানীফা রহ. থেকে বরকত গ্রহণ করিপ্রতিদিন আমি তাঁর কবর যিয়ারত করতে আসিযখনই আমার কোন প্রয়োজন দেখা দেয় তখনই দুই রাকাত নামায পড়ে তাঁর কবরের পাশে এসে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করিআলহামদুলিল্লাহ্এভাবে সব সময়ই আমার প্রয়োজন পুরা হয়েছে। (তারীখে বাগদাদ ১/১২৩, জাহানে দীদাহ্ ৪২-৪৩, হুদূদে এখতেলাফ ৯৯-১০০) এজন্যই ইমাম শাফেয়ী রহ. বলতেন, ফিকহের ক্ষেত্রে দুনিয়ার সকল মানুষ ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর পরিবারভুক্ত। (সিয়ারু আলামিন নুবালা ৬/৪০৩, মানাকিবু আবী হানীফা; যাহাবী, ২৫) 

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. বলেন, তিন ব্যক্তি যদি কোন মাসআলায় থাকে তাহলে এর বিপরীত কোন বক্তব্য শোনা হবে নাআর তারা হলেন, ইমাম আবূ হানীফা, আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মাদ কারণ, ইমাম আবূ হানীফা হলেন, ফিকহের সবচেয়ে বড় ইমামআবূ ইউসুফ হলেন বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় মুহাদ্দিসআর মুহাম্মাদ আরবী ভাষা  সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী বিজ্ঞএজন্যই তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনি এতো মাসআলা কোত্থেকে সংগ্রহ করেছেন? তখন তিনি বলেছেন, ইমাম মুহাম্মাদের কিতাবসমূহ থেকে। (সিয়ারু আইম্মাতিল আহনাফ পৃ. ১৮৬)

হানাফীদের গোড়ার কথা 

ইয়াহয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তান রহ. বলেন, এই উম্মতের মধ্যে হাদীস সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জানেন ইমাম আবূ হানীফা রহ.। (কিতাবুত-তালীম পৃ. ১৩৪) তিনি আরো বলেন, আমরা মিথ্যা বলতে পারবো নাইমাম আবূ হানীফার চেয়ে উত্তম রায় আমরা কখনো শুনিনিতাই তাঁর বক্তব্য সমূহই আমরা গ্রহণ করেছি। (তাহযীবুত-তাহ্যীব ৭/৩২৫)

হযরত আব্দুল্লা ইবনুল মুবারক রহ. বলেন, একবার আমি শামে ইমাম আওযায়ীর কাছে গেলামতখন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কূফার আবূ হানীফা নামের বেদআতীটা কে? আমি কোন উত্তর না দিয়ে বাড়ীতে এসে ইমাম আবূ হানীফার কিতাবগুলো মুতালাআকরে সুন্দর সুন্দর কিছু মাসআলা বের করলামঅতঃপর তৃতীয় দিন কিতাবটি হাতে নিয়ে আওযায়ীর কাছে উপস্থিত হলামআর তিনি ছিলেন মসজিদের মুআযযিন ও ইমাম আমার হাতে কিতাব দেখে বললেন এটা কিসের কিতাব? আমি তখন কিতাবটি তাঁকে দিলামতিনি কিতাবের মাসআলায় নযর করে দেখলেন, তাতে আমি লিখে রেখেছি নুমান বলেছেনতিনি আযানের পর থেকে নামাযের আগ পর্যন্ত সময়ে কিতাবের অর্ধেক পড়ে ফেললেনতারপর কিতাবটি আস্তিনে রেখে দিলেন

হাদীসের গল্প শোন! 

নামায শেষে আবার কিতাব পড়তে আরম্ভ করলেনএক পর্যায়ে আমাকে তিনি প্রশ্ন করে বসলেন, এই খুরাসানী! নুমান কে? আমি বললাম, ইরাকের একজন শায়েখআওযায়ী বললেন, ইনি তো মাশায়েখদের মধ্যে একজন মর্যাদাবান ও মহৎ ব্যক্তিযাও! তাঁর কাছ থেকে খুব বেশী ফায়দা অর্জন করতে থাকোতখন আমি বললাম, ইনিই সেই আবূ হানীফা যার থেকে আপনি আমাকে নিষেধ করেছেন এর কিছু দিন পরের কথাআমরা সবাই মক্কায় একত্র হলামতখন আওযায়ী ঐ সকল মাসআলা নিয়ে ইমাম আবূ হানীফার সাথে আলোচনা করলেনউভয়ে পৃথক হলে আমি আওযায়ীকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন দেখলেন? তিনি বললেন, তাঁর ইলম ও আকল দেখে আমি ঈর্ষাণ্বিত হয়েছিআমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছিআহ্! আমি তো এতদিন প্রকাশ্য ভুলের মধ্যে ছিলামযাও! তুমি তাকে তোমার জীবনের জন্য আবশ্যক করে নাওআমি এতদিন তাঁর সম্পর্কে ভুল শুনেছি। (তারীখে বাগদাদ ১৩/৩৩৮)

মায়ের কাছে চিঠি 

মিসআর ইবনে কিদাম রহ. বলেন, আমরা ইমাম আবূ হানীফার সাথে হাদীস ও ফিক্হ শিখেছিউভয় ক্ষেত্রে তিনি আমাদের সর্বাগ্রে ছিলেনএমন কি যুহদের ক্ষেত্রেও। (আল-ইমাম ইবনু মাজাহ্ পৃ. ৫০) ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. বলেন, আমরা আবূ হানীফার সাথে ইলমী বিষয়ে মুযাকারা করতামতিনি কোন মন্তব্য করলে সবাই তার উপর একমত হওয়ার পর আমি কূফার মাশায়েখদের কাছে এ উদ্দেশ্যে যেতাম যে, হয়তো এর স্বপক্ষে আমি কোন হাদীস পেয়ে যাবো

তো কখনো দুইটি কিংবা তিনটি হাদীস নিয়ে আসতামইমাম আবূ হানীফা তার কিছু গ্রহণ করতেন আর কিছু পরিত্যাগ করেতেন এবং বলতেন, এটা সহীহ্ নয়আর এটা মারুফ নয়আমি বলতাম, আপনি জানলেন কী করে? তিনি বলতেন, আমি কূফাবাসীর সকল ইলমের অধিকারী। (মানাকিবু আবী হানীফা; মুয়াফফাক মক্কী, পৃ. ৪০৯) এজন্যই হাফেয যাহাবী রহ. বলেছেন, আবূ হানীফা গোটা পৃথিবীর বনী আদমের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ব্যক্তি। (আল-ইবার ১/২১৪)

শায়েখ আলবানীর এপিঠ ওপিঠ 

হযরত ইবনে শুবরুম্মাহ্ বলেন, আমি ইমাম আবূ হানীফাকে সবচেয়ে তুচ্ছ জ্ঞান করতামকিন্তু একবার মক্কায় একটি মাসআলায় তাঁর সমাধান দেওয়া দেখে বুঝলাম আসলেই তিনি একজন বড় ফকীহসে দিন থেকে আমার ভুল ভাংলোআর আমি তাকে কল্যাণের সাথে স্বরণ করতে থাকলাম। (আল-ইন্তেকা পৃ. ২৯৯-৩০০)

হযরত আবূ মুতীরহ. বলেন,একবার আমি আবূ হানীফার কাছে বসা ছিলামএমন সময় সুফিয়ান ছাউরী, মুকাতিল বিন হাইয়ান, হাম্মাদ বিন সালামা ও জাফার সাদেক সহ আরো অনেকেই প্রবেশ করলেনতারা ইমাম আবূ হানীফার সাথে কিয়াস নিয়ে কথা বললেনতারা এও বললেন যে, সর্বপ্রথম কিয়াস করেছে ইবলিসতাই আমরা আপনার উপর আশংকা করি

মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের জীবন ও কর্ম 

তখন ইমাম আবূ হানীফা রহ. তাদের কথার জবাব দিতে থাকলেনজুমার দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এই আলোচনা চলতে থাকলপরিশেষে তারা সকলেই উঠে গেলেন এবং ইমাম আবূ হানীফার হাত ও হাটু চুম্বন করে বললেন, আপনি উলামায়েকেরামের সরদারআপনার সম্পর্কে এর আগে আমাদের না জেনে অশুভ মন্তব্য করার কারণে আমাদেরকে ক্ষমা করুনতখন আবূ হানীফা রহ. দুআকরলেন, আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে এবং আপনাদের সকলকে ক্ষমা করুন। (মাকানাতু আবী হানীফা পৃ. ১৮৪)

আল্লামা ইবনে নাদীম রহ. যার সম্পর্কে বলেছেন,তাঁর ইলম পৃথিবীর আনাচে-কানাচে, জলে ও স্থলে, পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত হয়ে আছে। (আল-ফিহরিস্ত, পৃ. ২৮২) তাঁর ইলমী কারনামার কথা আমি আর কি লিখব? ইমাম আব্দুল্লাহ্ ইবনে দাঊদ আল খুরাইবী রহ. এক কথায় যার ইতি টেনেছেন,ইমাম আবূ হানীফার ইলমী খেদমতের কারণে সকল মানুষের তাঁর জন্য তাদের নামাযে দুআ করা উচিৎ। (মাকানাতু আবী হানীফা ফিল হাদীস, পৃ. ১০৯)

আবুল ওয়াফা আফগানী সাহেবের জীবন ও কর্ম 

হাফেয ইবনে হাজার রহ. বলেন, ইরাকে ফিক্বহের নেতৃত্ব ইমামে আযম আবূ হানীফা রহ. এর কাছে শেষ হয়েছে। (আল-ইন্তেকা, পৃ. ১১৯) ইমাম আবূ হানীফা রহ. যুগ শ্রেষ্ঠ একজন তাবেয়ী ছিলেন। (দেখুন: মাকানাতু আবী হানীফা; ১০৫-১০৬, ১০৮, ১১৬, ১৬৭, তানীবুল খতীব; ৩২-৩৩, ৪১-৪৪) আল্লামা আব্দুশ শহীদ নুমানী দা. বা. তো এ ব্যাপারে স্বতন্ত্র একটি গ্রন্থই রচনা করেছেনযার নাম দিয়েছেন, ‘ইমাম আবু হানীফা কি তাবিইয়্যাত আওর সাহাবা সে উনকি রেওয়ায়াতআগ্রহী পাঠক তা পড়ে দেখতে পারেন

একদা ইমাম আবূ হানীফা রহ. তাবেয়ী হযরত আমাশ রহ. এর কাছে ছিলেনযখন ইমাম সাহেবকে কোন মাসআলা জিজ্ঞাসা করা হতো তিনি বলতেন, এই মাসআলায় আমার মতামত এই...হযরত আমাশ রহ. বলতেন, কী দলীল আছে তোমার কাছে? ইমাম আবূ হানীফা রহ. বলতেন, আপনিই তো আমাকে আবূ সালেহ্ এর সূত্রে হযরত আবূ হুরাই রা. থেকে, আবূ ওয়াইল এর সূত্রে হযরত ইবনে মাসঊদ রা. থেকে, আবূ ইয়াস এর সূত্রে হযরত আবূ মাসঊদ আনসারী রা. থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কল্যাণের দিকে পথ দেখায় অন্যের আমলের অনুরুপ সাওয়াব তার জন্যও লেখা হয়এমনিভাবে হযরত হুযাইফা, জাবের, আনাস রা. থেকে আরো অসংখ্য হাদীস আপনি বর্ণনা করেছেন

শায়েখ আব্দূল ফাত্তাহ্ আবু গুদ্দাহ্ রহ. এর জীবন ও কর্ম 

তখন হযরত আমাশ রহ. বললেন, ব্যস, যথেষ্ট! আমি একশদিনে তোমার কাছে যত হাদীস বর্ণনা করেছি তুমি এক মূহুর্তে তা শুনিয়ে দিলেআমি তো জানতামই না যে, তুমি এসব হাদীসের উপর আমল করছোহে ফুক্বাহায়ে কেরামের দল! শুনে রাখো! তোমরা ডাক্তারআর আমরা হলাম ফার্মাসিস্ট বা ভেষজবিজ্ঞানীআর তুমি (আবূ হানীফা) এই উভয় দিককেই গ্রহণ করেছো। (আছারুল হাদীসিশ শারীফ; পৃ. ১২২-১২৩)

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হযরত যুফার রহ. ইমামে আযম আবু হানীফা রহ. এর মাযহাব গ্রহণের কারণ হলো, একবার তিনি ও তার সঙ্গীদের কাছে একটি মাসআলার সমাধান বের করা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ালোফলে তিনি ইমাম আবূ হানীফার কাছে আসলেনইমাম সাহেব তার প্রশ্নের উত্তর দিলে হযরত যুফার তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এটি আপনি কোত্থেকে বললেন? ইমাম আবূ হানীফা রহ. বললেন, ওমুক হাদীস এবং এই এই কিয়াসের কারণে

আল্লামা তাফাজ্জুল হক রহ. এর সোহবতে কিছুক্ষণ 

অত:পর হযরত যুফারকে লক্ষ করে আবূ হানীফা রহ. বললেন, মাসআলার সূরত এরকম হলে উত্তর কেমন হতো? যুফার বললেন, এক্ষেত্রে তো আমি আগের মাসআলার চেয়েও বেশী অন্ধতখন আবূ হানীফা রহ. তারও জবাব দিয়ে দিলেনহযরত যুফার বলেন, এরপর তিনি আরো একটি মাসআলার সমাধান আমাকে দিলেনএসব মাসআলা নিয়ে আমি আমার সঙ্গীদের কাছে ফিরে এলাম

তাদের কাছে এগুলোর সমাধান জানতে চাইলে দেখলাম, এ ব্যাপারে তারা আমার চেয়েও বেশী অন্ধতখন আমিই তাদেরকে এগুলোর জবাব শুনালাম এবং তার কারণও উল্লেখ করলামতারা বললো, আপনি এসব কোথায় পেলেন? আমি বললাম, আবূ হানীফার কাছ থেকে ফলে এই তিন মাসআলার কারণে আমিই মজলিসের নেতা বনে গেলাম

মধুপুরী দা. বা. এর মুনাজাত 

এরপরই হযরত যুফার রহ. ইমাম আবূ হানীফার দিকে প্রত্যাবর্তন করলেন এমনকি হানাফী মাযহাবের বড় বড় দশজন ফক্বীহের মধ্য থেকে তিনিও একজন হলেন যারা ইমামে আযমের সাথে কিতাব সংকলনের কাজ করেছেন। (ইমাম সাইমারী রহ. কৃত মানাকিবু আবী হানীফা; ১০৭) এরকম অসংখ্য ঘটনা ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যাবে যা কেবল ইমামে আযমের মর্যাদাকেই বৃদ্ধি করেনা বরং মুসলিম উম্মাহর কাছে তাঁর মাযহাবের দৃঢ়তা ও স্বচ্ছতাও প্রকাশ্য হয়ে উঠে

কিন্তু আফসোস! বর্তমানে কিছু লোক এরকম পাওয়া যায় যারা খাইরুল কুরুনের এসব উলামায়ে কেরামের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে থাকেঅশুভ উক্তি, কটু বাক্য এবং অশালীন ভাষায় তাদেরকে গালি-গালাজ করে থাকেবিশেষত: ইমামে আযম আবূ হানীফাকে এমন ভাষায় গালি দিয়ে থাকে যা কোন মানুষের তো দূরের কথা, কোন হাইওয়ানের স্বভাবও হতে পারে নাবোধহয় একটু বেশী বলে ফেললাম

muslim-killing-kidnaping-in-bangladesh (গুম, হত্যা, জুলুম। কেন প্রতিশোধ নয়?) 

কিন্তু প্রিয় পাঠক! বর্তমান বাজারে হাতের নাগালের বাংলা কিছু বই পরলেও আপনি বিষয়টি আন্দাজ করতে পারবেনসেসব বলে আমরা আমাদের যবানকে নোংড়া করতে চাই নাতবে পাঠকের সামনে আমি কেবল উলামায়ে কেরামের কিছু বক্তব্য নকল করতে চাইযাতে এর বাস্তবতা ও ভয়াবহতা আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে যায় মনে রাখতে হবে আহলে ইলমকে গালি-গালাজ করা কবীরা গুনাহ। (মুফতী দেলোয়ার সাহেব দা. বা. কৃত তাসকীনুল আরওয়াহ্৬/৪৬২. অপ্রকাশিত।)

আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন,আল্লাহ্ তায়ালা যার বক্ষকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করেছেন তার জন্য ওয়াজিব হলো, তার কাছে আইম্মায়ে কেরামের কারো ব্যাপারে দুর্বল কোন বক্তব্য পৌঁছলে লোকদের কাছে তা বর্ণনা না করাবরং বক্তব্যের সত্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত হলে বর্ণনা করা থেকে চুপ থাকবেনতুবা গ্রহণের ব্যাপারে অপেক্ষা করবেকারণ, আইম্মায়ে কেরাম সম্পর্কে যা কিছু বলা হয় তার অধিকাংশেরই কোন বাস্তবতা নেই। (মাকানাতু আবী হানীফা; ১১৩-১১৪)

হাফেয যাহাবী রহ. বলেন,সমসাময়িক উলামায়ে কেরামের একজনের ব্যাপারে অপরজনের বক্তব্যের কোন গ্রহণযোগ্যতা নেইবিশেষত: যখন এটা প্রমাণিত হবে যে, তা ছিলো শত্রুতার কারণে, হিংসা-বিদ্বেসের কারণে কিংবা মাযহাবি পক্ষপাতিত্বের কারণেএর থেকে কেউই রেহাই পায়নিতবে আল্লাহ্ যাকে নিরাপদ রেখেছেন

আমার জানা মতে কোন যুগই এরকম নেই আম্বিয়া ও সিদ্দীক্বীন ছাড়া যে যুগের লোকেরা তা থেকে নিরাপদ থেকেছেআমি চাইলে এ সম্পর্কে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখতে পারিঅন্যত্র তিনি বলেন, সবসময়ই সমসাময়িক উলামায়ে কেরাম একে অপরের ব্যাপারে তাদের ইজতেহাদ অনুযায়ী কথা বলেছেনআর একমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া বাকী সকল মানুষের বক্তব্যের কিছু গ্রহণীয় আর কিছু বর্জনীয়। (আল-ইন্তিক্বা; ২৭৭-২৭৮)

ইমাম ত্বহাবী রহ. বলেন,আমাদের পূর্ববর্তী উলামায়ে সালাফ এবং তৎপরবর্তী তাবিঈনেকেরাম যারা মুহাদ্দিস, ফক্বীহ্, ঐতিহাসিক কিংবা আহলে নযর তাদেরকে আমরা সুন্দর ও কল্যাণের সাথে স্বরণ করবোযে তাদের সাথে অশুভ আচরণ করবে সে দ্বীনের সঠিক রাস্তা থেকে বিচ্যুত হবে। (মাকানাতু আবী হানীফা; ৫৪-৫৫)

আল্লামা ইবনুল আছীর রহ. বলেন,ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর ফাযায়েল ও মানাকেব বলতে শুরু করলে আমাদের আলোচনা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবেএক কথায় তিনি ইলমকে আমলে সম্পন্নকারী একজন আলেমযাহেদ , আবেদ, মুত্তাক্বী এবং ইলমে শরীয়তের একজন স্বীকৃত ইমামতাঁর সম্পর্কে অনেক বানোয়াট কথা শোনা যায়সেসব বক্তব্য এবং প্রবক্তাদের আলোচনার কোন প্রয়োজন নেইকারণ, তিনি তো এ থেকে পবিত্র

এর সবচেয়ে বড় দলীল হলো, পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে তাঁর সুনাম সুখ্যাতী, ইলমের বিস্তৃতী, তার মাযহাব ও ফিক্বহের গ্রহণীয়তা এমনভাবে বিকশিত হয়েছে যাতে আল্লাহ্ তায়ালার রিযা এবং গুঢ় তত্ত্ব নিহিত আছেযে কারণে মুসলিম উম্মাহর প্রায় অর্ধাংশ তাঁর মাযহাবের তাক্বলীদে একত্র হয়েছেইসলাম ও মুসলমানদের কাছে তাঁর অবস্থান থাকার পরে আর কোন দলীলের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। (প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৩-১১৪।)

আল্লামা আব্দুল ওয়াহাব শারানী রহ. বলেন,রায় ও কিয়াসের নিন্দা করতে গিয়ে আইম্মায়ে আরবাআসম্পর্কে যা বলা হয় সর্ব প্রথম ইমামে আযম আবূ হানীফা রহ. তা থেকে মুক্তকিছু গোঁড়া লোকেরাই তাঁর সম্পর্কে যা কিছু বলে থাকেকেয়ামতের দিন ইমাম আবূ হানীফার মুখোমুখি হলে লজ্জায় মাথা অবনতকারী হে ব্যক্তি! কেমন লাগবে তখন? শুনে রাখো! যার অন্তরে নূর আছে সে কখনো আইম্মায়ে কেরামকে অকল্যাণের সাথে স্বরণ করতে পারে নাআরে কোথায় দাঁড়িয়ে কী বলছো?

আইম্মায়ে কেরাম তো আকাশের নক্ষত্র তুল্যআর বাকীদের দৃষ্টান্ত হলো, দুনিয়ার মানুষের মতনক্ষত্র সম্পর্কে যাদের পানির উপর ধারণা ছাড়া আর কোনই খবর নেইউলামায়ে কেরাম তো শরীয়িত প্রণেতার পক্ষ থেকে তাঁর শরীয়তের আমিনসুতরাং তারা উম্মতের জন্য যা বলে গেছেন এবং শরীয়ত থেকে যা ইস্তেনবাত করেছেন তার মধ্যে কোন উদ্ভট ও অশুভ মন্তব্য চলবেনাবিশেষত: ইমাম আবূ হনীফা রহ.কেননা, তিনি ইমামদের মধ্যে বড় ও মর‌যাদাবান ইমাম

সংকলনের দিক থেকে তাঁর মাযহাবই প্রবীণসাথে সাথে তিনি সনদের দিক থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুব কাছাকাছি এবং তাবিঈনে কেরামের আমলের প্রত্যক্ষদর্শীআর কিভাবেই বা আমাদের মত মানুষ তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারে পৃথিবীর সকল মানুষ যার ইলম, তাক্বওয়া, ইবাদাত, মুরাক্বাবা, তার শ্রেষ্ঠত্¦ ও বিশেষত্বকে নির্দিধায় মেনে নিয়েছে? আসলে এদেরকে অন্ধই বলতে হবেসুতরাং সাবধান হে মানুষ!

অন্যদের মত আইম্মায়ে কেরামের দোষ বর্ণনায় তুমিও গা ভাসিয়ে দিওনাতাহলে তোমার দুনিয়া আখেরাত দুটাই বরবাদ হবেকারণ, ইমাম আবূ হানীফা রহ. ছিলেন কিয়াসমুক্ত কুরআন ও সুন্œাহর পূর্ণ অনুসারীযে তাঁর মাযহাব নিয়ে গবেষণা করবে সে বুঝতে পারবে যে, দ্বীনের ক্ষেত্রে তাঁর মাযহাব কতটা সতর্কতাপূর্ণএরপরও কেউ উলটা বললে সে আসলেই একজন অজ্ঞ, গোঁড়া এবং অযথা অস্বীকারকারী। (প্রাগুক্ত, ১১৮-১২০।)

হাফেয যাহাবী রহ. বলেন,ইজতেহাদের ক্ষেত্রে কোন কোন মাসআলায় ছোটখাট ভুলের কারণে যদি আমরা আইম্মায়ে কেরামের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়, তাদেরকে বেদাতী সম্বোধন করি, কিংবা তাদেরকে পরিত্যাগ করে বসি তাহলে আমাদের কাছে ইবনে নাসর, ইবনে মান্দাহ্ কিংবা তাদের চেয়ে বড় বড় ব্যক্তিরাও নিরাপদ থাকবে না। (আদাবুল ইখতেলাফ, পৃ. ১৯।)

বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় 

তিনি আরো বলেন,আইম্মায়ে কেরামগণ সর্বদাই মতোবিরোধ করতে থাকবেন এবং একে অপরের উপর খন্ডন করে যাবেনকিন্তু তাই বলে আমরা খাহেশাত ও অজ্ঞতার কারণে তাদেরকে নিন্দা করতে পারি না। (সিয়ারু আলামিন নুবালা; ১৯/৩৪২।) অন্যত্র বলেন, ‘সকল ইমামদের ব্যাপারেই নিন্দাকারীরা নিন্দা করেছে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত লোকেরা ধ্বংস হয়েছে। (আরবাউ রাসায়েল; ২০।) হাফেয ইবনে আব্দিল বার রহ. বলেন, যার ইমামাত ও আদালাত স্বীকৃত এবং যার নির্ভরযোগ্যতা ও ইলমের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণিত, তার ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তির কোন কথার দিকেই কর্ণপাত করা যাবেনা। (প্রাগুক্ত ২২।) 

হাফেয আবূ নাসর শাইখুল ইসলাম আব্দুল ওয়াহাব রহ. বলেন,হে সঠিক পথ অণ্বেষী! তোমাদের উপর আবশ্যক হলো, আমাদের গত হয়ে যাওয়া ইমামদের সাথে আদবের আচরণ করাতাদের পরষ্পরের মাঝে কোথাও কোথাও ঔদ্যতাসূলভ আচরণ কখনো হয়ে থাকলে আমাদের কাজ হলো তাদের সাথে হ্রদ্যতাপূর্ণ আচরণ করাসেসব বিষয়ে কর্ণপাত করা আমাদের কাজ নয়। (মাকানাতু আবী হানীফা; ১৪৯।) হাফেয ইবনু আব্দিল বার রহ. বলেন, ‘আহলে হাদীসগণ ইমাম আবূ হানীফার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে এবং মারাত্নক পর্যায়ের সীমালঙ্ঘণ করেছে। (প্রাগুক্ত ১৫৪।)

মানুষ মাত্রই ভুল

মানুষ মাত্রই ভুলকিন্তু সেই ভুলের চর্চা করার অনুমতি শরীয়ত দেয় না এবং ভুলের কারণে মানুষ ছোট হয়ে যায় নাএইজন্যই আল্লামা আহনাফ বিন কাইস বলেন, ‘কামেল সেই ব্যক্তি যার ভুল গণনা করা হয়। (নামাযিজু মিন রাসাইলিল আইম্মাতিস সালাফ, ৫৯)

হাফেয সাখাভী রহ. বলেন,যার ভুল গণনা করা হয় সেই সৌভাগ্যবান। (আরবাউ রাসায়েল; ৪৭)শায়েখ আলী তানতাবী রহ. বলেন, ‘কোন ব্যক্তির দোষ গণনা করাই তার মহৎ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। (হাকাযা রব্বানা জাদ্দী; ২৯, বাংলা।) তাই কারো ভুল হওয়া তার পূর্ণতার সুষ্পষ্ট প্রমাণকিন্তু সেই ভুলের চর্চা করার মধ্যে ক্ষতি ছাড়া কোন কল্যাণ নেই

দুখেঃর সাথে বলতে হয়, বর্তমানে ভুল ধরা কিংবা গালি-গালাজের প্রচার করাটা যেনো কারো পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছেযেমন: একজন একটা কিতাব লিখেছেন যার নাম দিয়েছেন, ‘নাশরুস সহীফাহ্ ফী যিকরিস সহীহ্ মিন আকওয়ালি আইম্মাতিল জারহি ওয়াত-তাদীল ফী আবী হানীফাযেখানে কেবল ইমাম আবূ হানীফার দোষগুলো তুলে ধরা হয়েছে। (মানহাজুল হানাফিয়্যাহ্ ফী নকদিল হাদীস; ৫৭।)

সুওয়ালাতু আবী হামযা আস-সাহমীকিতাবের টীকায় এরকমই একটি কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে শায়েখ আবূ উমর মুহাম্মাদ বিন আলী আল-আযহারী একারণেই বোধহয় দ্বিতীয় শতাব্দির প্রখ্যাত আলেম আল্লামা সুনাইদ বিন দাঊদ রহ. বলেছেন, ‘যখনই আল্লাহ্ তায়ালা বান্দাদের মধ্য থেকে কাউকে কোন বিষয়ের প্রতিনিধি নিয়োগ করেন তখন শয়তান তার সামনে দুটি জিনিস নিয়ে হাযির হয়তার জানা থাকে না কোনটিতে সে সফল হবেএকটি হচ্ছে, সীমালঙ্ঘণ এবং অপরটি হচ্ছে খাটোকরণ। (সিয়ারু আলামিন নুবালা; ৯/২৩৬)

তাই পাঠকের কাছে আমার কড়জোর নিবেদন হলো, আমরা ইমামদের ব্যাপারে কোন প্রকার বাড়াবাড়িতে না জড়াইসকলকে আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্বরণ করবো- এই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞাকেনো নয়? আপনি কি পারবেন আপনার পিতার ভুলগুলো নিয়ে সমাজে ফেৎনা সৃষ্টি করতে? হ্যাঁ, তারা তো আমাদের পিতৃতুল্যতাদের মত ব্যক্তিবর্গ এ যুগে আমাদের এনে দেখান না! তবে কেনো এতো গালা-গালি? আল্লাহ্ আমাদেরকে হেফাযত করুনআমিন

আর যারা ইমাম আবূ হানীফা সম্পর্কে অশুভ মন্তব্য করে থাকেদাজ্জাল, কাযযাব, কাফের আরো অসংখ্য গালিগালাজ করতে থাকে তাদেরকে একটি কথা স্বরণ করিয়ে দিতে চাই যা হাফেয ইবনে আসাকির রহ. বলেছেন, উলামায়েকেরামের গোস্ত হলো বিষযে ঘ্রাণ নিবে সে অসুস্থ হয়ে পড়বেআর যে খাবে সে মরে যাবে। (উকূদুল জুমান পৃ. ৩১)শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ্ আবূ গুদ্দাহ্ রহ. বলেন, উলামায়েকেরামের গোস্ত হালাল মনে করে কেউ সফল হতে পারবে না। (সালাসু রাসায়েল পৃ. ২২)

والحمد لله رب العالمين و صلى الله على سيدنا محمد وآله وأصحابه أجمعين

বান্দা মুহাম্মদ সাঈদুর রহমান সিদ্দীক নাটোরী, খাদেমে দারুল ইফতা ও শিক্ষাসচিব- মারকাযুল উলূমিদ্ দ্বীনিয়্যাহ্ভেলানগর,(জেলখানার মোড়)নরসিংদীবাংলাদেশ

আগের সবগুলো পর্ব পড়ুন- ১ম পর্ব, ২য় পর্ব, ৩য় পর্ব, ৪র্থ পর্ব, ৫ম পর্ব, ৬ষ্ঠ পর্ব

Post a Comment

do not share any link

নবীনতর পূর্বতন